শিগগিরই সিরিয়া সফরে যেতে পারেন এরদোগান, আঙ্কারা-দামেস্ক সম্পর্কে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত
লেখক:
ঢাকা
সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সাথে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেপ এরদোগানের বহুল প্রতীক্ষিত সিরিয়া সফর শিগগিরই হতে পারে। তুর্কি সংবাদপত্র ডেইলি সাবাহ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ও আগামী মাসে এরদোগানের ব্যস্ত কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ, অক্টোবরে অর্গানাইজেশন অব টার্কিক স্টেটসের নেতাদের আতিথ্য এবং নভেম্বরে আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।
এসব পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির আগে অথবা পরে এরদোগান সিরিয়া সফর করতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর এটিই হবে সিরিয়ায় তাঁর প্রথম সফর।
ডেইলি সাবাহ-এর সাংবাদিক ইউসুফ জিয়া দোরমুশ লিখেছেন, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সম্প্রতি দামেস্ক সফর করেছেন। সেখানে তিনি সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি এরদোগানের সম্ভাব্য সিরিয়া সফরের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে হাকান ফিদানও নিশ্চিত করেছেন যে এরদোগানের দামেস্ক সফরের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এরদোগানও এর আগে বিভিন্ন ভাষণে সিরিয়া সফরের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইনশাআল্লাহ’ তিনি সিরিয়া সফর করবেন।
দোরমুশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বসন্তে এরদোগানের সিরিয়া সফরের পরিকল্পনা ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের কারণে সেই পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। এরদোগানের ব্যস্ত কর্মসূচির কারণে সফরটি আরও পিছিয়ে যেতে পারে এবং ডিসেম্বর মাসে সিরীয় বিপ্লবের বার্ষিকীর সঙ্গে সফরটি মিলতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সফরটি হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতীকী ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন নতুন সিরীয় সরকারের প্রতি তুরস্কের সমর্থন আরও স্পষ্ট হবে।
দোরমুশ বলেন, প্রায় ১৬ বছর পর কোনো তুর্কি প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাসীন অবস্থায় দামেস্ক সফর করতে যাচ্ছেন। বাশার আল-আসাদের শাসনের শুরুর দিকে এরদোগানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়নের পর আঙ্কারার অবস্থানে পরিবর্তন আসে।
পরবর্তী সময়ে তুরস্ক সিরিয়ার বিরোধীদের সমর্থন দেয়। একই সঙ্গে সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় উত্তর সিরিয়ায় তুরস্ক একাধিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরদোগানের সম্ভাব্য সফরে প্রতীকী বিভিন্ন কর্মসূচি থাকতে পারে। এর আগে হাকান ফিদানের দামেস্ক সফরের সময় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে কাসিয়ুন পর্বতে চা পান করার দৃশ্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। এরদোগানও কাসিয়ুন পর্বতে যাবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। একসময় এই পর্বত সিরীয়দের জন্য অনেকটাই নিষিদ্ধ এলাকা ছিল এবং সেখানে বাথ সরকারের সামরিক ইউনিট মোতায়েন ছিল।
এ ছাড়া দামেস্কের ঐতিহাসিক উমাইয়া মসজিদে এরদোগানের নামাজ আদায়ের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়
এরদোগানের সফরে সিরিয়ার নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ঐক্য ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে। এর মধ্যে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস বা এসডিএফকে সিরিয়ার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
দোরমুশের মতে, তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে এসডিএফকে দামেস্কের সঙ্গে একীভূত করার ওপর জোর দিয়ে আসছে। আঙ্কারার দৃষ্টিতে এর মাধ্যমে তুরস্কের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়ার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ঐক্য জোরদার করা সম্ভব হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসডিএফকে একীভূত করার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। ২০২৫ সালে এসডিএফের নেতা ফারহাত আবদি শাহিন ও প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির পর এ প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হয়েছে।
এদিকে তুরস্কের অভ্যন্তরেও পিকেকে-সংক্রান্ত নিরাপত্তা সমস্যার সমাধানে একটি পৃথক প্রক্রিয়া চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রশ্নের সমাধান তুরস্কের ঘোষিত ‘সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতায় গুরুত্ব
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এরদোগানের সফর থেকে নতুন ঘোষণা আসতে পারে বলে ডেইলি সাবাহ আশা করছে। যুদ্ধের বছরগুলোতে সিরিয়ার অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন দেশটির পুনর্গঠন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন বিনিয়োগ ও নির্মাণ চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি খাতে তুরস্কের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকায় সিরিয়ার পুনর্গঠনে দেশটির বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিরিয়ায় নতুন সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো এবং যৌথ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কমিটি গঠনের লক্ষ্যে চুক্তি করেছে। এরদোগানের সফরে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নিয়েও আলোচনা হতে পারে
সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরাইলের সামরিক তৎপরতার বিষয়টিও এরদোগান ও আহমেদ আল-শারার বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ডেইলি সাবাহ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরাইল-সিরিয়া সীমান্তের সিরীয় অংশে জাবাল আল-শেখ বা মাউন্ট হারমন পরিদর্শন করেন। সিরিয়া ও দেশটির সহযোগীরা ঘটনাটিকে সিরীয় ভূখণ্ডে ইসরাইলের অনুপ্রবেশের উদাহরণ হিসেবে দেখছে।
এ ছাড়া সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানবন্দরে ইসরাইলি হামলা নিয়েও তুরস্ক অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে ওই এলাকায় তুর্কি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। আঙ্কারা বিভিন্ন সময় ইসরাইলের বিরুদ্ধে সিরিয়ায় সরাসরি হামলা এবং আহমেদ আল-শারা সরকারের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে দেশটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে।
দোরমুশের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এরদোগানের সিরিয়া সফর হলে আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও সিরিয়ার পারস্পরিক সহযোগিতার একটি বার্তা সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরাইলের সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের অবস্থান আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
তুরস্ক-সিরিয়া সম্পর্কে নতুন অধ্যায়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরদোগানের সম্ভাব্য সিরিয়া সফর দুই দেশের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে ৯০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সিরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সময় বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে আসাদ সরকারের বিরোধীদের সমর্থন—বিভিন্ন পর্যায়ে তুরস্ক সিরিয়া সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আহমেদ আল-শারা সিরিয়ার নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে এরদোগানের একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। সর্বশেষ জুলাইয়ে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়।
ডেইলি সাবাহ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরদোগানের সম্ভাব্য দামেস্ক সফর হলে তা তুরস্ক ও সিরিয়ার সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়ার পুনর্গঠন, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিতে পারে।
সূত্র : ডেইলি সাবাহ



