রাজনীতির ভস্ম ও স্মৃতির সংরক্ষণ

পড়তে ১ মিনিট

বসনিয়া-হার্জেগোভিনার পোটোকারিতে অবস্থিত স্মৃতিসৌধের পাশে হাঁটছেন এক দর্শনার্থী। এখানে ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত সেব্রেনিৎসা গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করা হয়। ছবি: এএফপি।

বলকান অঞ্চল তার প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে এমন এক স্মৃতি জড়িয়ে আছে, যা কখনো পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়ে না। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত রাটকো ম্লাদিচের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেই পুরোনো ক্ষতকে আবারও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, সময়ের সঙ্গে ক্ষতটি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ম্লাদিচকে ‘বীর’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে তুরস্ক, ম্লাদিচকে বীর হিসেবে স্মরণ করার নিন্দা জানিয়েছে। বিষয়টি কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে আরও গভীর একটি উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে—যুদ্ধাপরাধীদের মহিমান্বিত করা শুধু নিহত ও নিপীড়িতদের স্মৃতির প্রতি অবমাননা নয়; এটি এ কথাও মনে করিয়ে দেয় যে অতীতের উত্তেজনা ও বিদ্বেষ পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে।

টিটোর যুগোস্লাভিয়া ‘ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য’ স্লোগানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুসৃত একটি রাজনৈতিক নীতি, যার লক্ষ্য ছিল ছয়টি প্রজাতন্ত্র ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন পরিচয়ের অধীনে রাখা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্লোগান প্রকৃত সামাজিক পুনর্মিলনের বিকল্প হতে পারে না। বরং ঐতিহাসিক ক্ষতগুলোকে দীর্ঘদিন চাপা রাখার ফলে বাইরে থেকে যে শান্তির চিত্র তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অনেকটাই ভঙ্গুর।

১৯৮০-এর দশকে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভঙ্গুরতার চিত্রও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে স্লোবোদান মিলোসেভিচের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি চরম জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণের ক্ষোভকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে।

১৩৮৯ সালের কসোভো যুদ্ধকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেন ঘটনাটি সুদূর অতীতের কোনো অধ্যায় নয়, বরং সমসাময়িক বাস্তবতার অংশ। পুরোনো ভুক্তভোগী হওয়ার ধারণাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা হয়। মধ্যযুগীয় তুর্কি আক্রমণের স্মৃতিকে সমসাময়িক বসনীয় মুসলিমদের সঙ্গে যুক্ত করে প্রতিশোধের মনোভাব উসকে দেওয়া হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং নাগরিকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রতিশ্রুতি পূরণে অক্ষমতা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে যৌথ স্মৃতিকে এভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

বর্বরতার নির্মাণ

এই প্রক্রিয়াকে অন্তত দুটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমটি হলো বংশানুক্রমিক মানসিক আঘাত। একটি গোষ্ঠী যখন নিজেদের চিরস্থায়ী ভুক্তভোগী হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন প্রতিরোধমূলক সহিংসতাকেও নৈতিকভাবে বৈধ মনে করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়টি হলো ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিলুপ্তি। ব্যক্তির অপরাধবোধ তখন জাতীয় কর্তব্য, গোষ্ঠীগত আনুগত্য কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালনের ধারণার মধ্যে হারিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশীকে গুপ্তচর এবং শিশুকেও ভবিষ্যৎ হুমকি হিসেবে দেখার মতো ভয়াবহ মানসিকতা তৈরি হতে পারে।

আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষা হওয়া উচিত—অস্ত্র তুলে নেওয়া এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা, তা বলকানেই হোক কিংবা সিরিয়ায়। সার্বিয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা নিজেদের ইতিহাসকে অস্বীকার না করেও তার অন্ধকার অধ্যায়গুলোর মুখোমুখি হতে পারে।

ম্লাদিচ সার্বিয়ার ইতিহাসের একটি অংশ হতে পারেন; কিন্তু তিনি একই সঙ্গে একজন দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী। এই দুটি সত্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি। অপরাধের নিন্দা করা কোনো একটি জাতিকে সামগ্রিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করার অর্থ নয়। একইভাবে কোনো জাতির সদস্য হওয়াও সেই জাতির অপরাধীদের ক্ষমা করা বা মহিমান্বিত করার কারণ হতে পারে না।

বর্তমান প্রজন্ম যে অপরাধ করেনি, তার দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি অতীতের অপরাধকে অস্বীকার করাও ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি স্মৃতিচর্চা গড়ে তোলা, যেখানে অপরাধের স্বীকৃতি থাকবে, কিন্তু নতুন প্রজন্মের ওপর উত্তরাধিকারসূত্রে অপরাধবোধ চাপিয়ে দেওয়া হবে না।

পরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলার কৌশল

ম্লাদিচের অধীনে রিপাবলিকা সর্পস্কার সেনাবাহিনী যে অভিযান পরিচালনা করেছিল, সেগুলোকে শুধু সামরিক অভিযান হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অভিযোগও রয়েছে।

লাইব্রেরি পুড়িয়ে দেওয়া, মসজিদ ও সেতু ধ্বংস করা ছিল একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপস্থিতি মুছে ফেলার প্রচেষ্টার অংশ। অন্যদিকে পুরুষ ও বালকদের হত্যা করে একটি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধারাবাহিকতা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সারায়েভো ও সেব্রেনিৎসায় এই প্রবণতা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। মানুষের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে একটি অঞ্চলের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়।

বসনীয় ক্রোয়াটদের ক্ষেত্রেও সংঘাতের চিত্র ছিল জটিল। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে মুসলিমদের সঙ্গে তাদের প্রাথমিক জোট ভেঙে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ হয়ে ওঠে। মোস্তারের ঐতিহাসিক পুরোনো সেতুতে গোলাবর্ষণ এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সেতুটি কেবল একটি স্থাপনা ছিল না; এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতীক। সেটিকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতির ওপরও আঘাত হানা হয়েছিল।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই আলিজা ইজেতবেগোভিচ একজন গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি নিজের সভ্যতাগত ও ধর্মীয় পরিচয় অস্বীকার না করেও যুদ্ধের নৈতিক সীমারেখা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। মুসলিম জনগণের ওপর সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ হিসেবে তিনি উপাসনালয় ধ্বংস করা কিংবা সার্ব ও ক্রোয়াট বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর পথ গ্রহণ করেননি।

১৯৯৫ সালে নিজের জনগণকে আরও বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে তিনি ডেটন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিটি ছিল তিক্ত সমঝোতা, কিন্তু এর মাধ্যমে রক্তপাত বন্ধের একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি যুদ্ধের বাইরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়।

আঞ্চলিক বাস্তবতা বাদ দিয়ে বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে বোঝা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের ভূমিকা তিনটি বিষয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ঐতিহাসিক সম্পর্ক—বলকানে শতাব্দীব্যাপী উসমানীয় উপস্থিতি স্থাপত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। দ্বিতীয়ত, জনসম্পর্ক—বসনীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশের সঙ্গে তুরস্কের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এখনও বিদ্যমান। তৃতীয়ত, কৌশলগত বাস্তবতা—পশ্চিম বলকানে আঞ্চলিক ভারসাম্য ও প্রভাবের ক্ষেত্রে বসনিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড।

একই সময়ে নতুন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যও তৈরি হচ্ছে। সার্বিয়াকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রকল্প ও বহিরাগত প্রভাবের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই মেরুকরণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এবং বলকানকে আবারও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র করে তুলছে।

শর্তাধীন পুনর্মিলন

ম্লাদিচের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো সংঘাতকে রাজনৈতিকভাবে স্তব্ধ করে রাখা আর সমাজের ভেতর থেকে তার ক্ষত মুছে ফেলা এক বিষয় নয়। যুদ্ধ শেষ হতে পারে, রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে, কিন্তু স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে অতীত বারবার বর্তমানের সামনে ফিরে আসতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও সার্বিয়ার ইউরোপীয় একীকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের মহিমান্বিত করা এবং গণহত্যা অস্বীকারের মতো বিষয়গুলোকে যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার স্মৃতি নিয়ে ইউরোপের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়।

অপরাধ ও ভুক্তভোগীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; বরং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। গণহত্যা অস্বীকারকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা এবং এমন স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ঐতিহাসিক সত্য রাজনৈতিক স্বার্থ ও কারসাজির ঊর্ধ্বে থাকবে—এগুলো সেই প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।

তবে স্মৃতিচর্চার লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন প্রজন্মকে অতীত সম্পর্কে সচেতন করা, তাদের ওপর এমন কোনো যৌথ অপরাধবোধ চাপিয়ে দেওয়া নয় যার জন্য তারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী নয়। ইতিহাসকে স্বীকার করা এবং উত্তরাধিকারসূত্রে অপরাধবোধ বহন করা এক বিষয় নয়।

ইজেতবেগোভিচের দৃষ্টিভঙ্গিতে গণহত্যা কেবল একটি রাজনৈতিক অপরাধ নয়; এটি মানুষের মর্যাদার বিরুদ্ধে একটি গভীর নৈতিক অপরাধ। তার ‘এসকেপ টু ফ্রিডম’ গ্রন্থেও অন্যায়ের মুখে নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি গুরুত্ব পেয়েছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো যুদ্ধাপরাধীকে মহিমান্বিত করার ঘটনা শুধু রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখা যায় না। এটি ভুক্তভোগীদের মর্যাদা ও ঐতিহাসিক সত্যের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। এর প্রভাব অতীতের নিহতদের স্মৃতির ওপর যেমন পড়ে, তেমনি যুদ্ধের পর জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপরও পড়তে পারে।

অতীতের ভস্ম তাই শুধু সংরক্ষণ করার বস্তু নয়; তা থেকে শিক্ষা নেওয়ারও উপাদান। একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে সামনে এগোতে পারে, যখন সে নিজের ইতিহাসের গৌরবের পাশাপাশি তার অপরাধ ও ব্যর্থতার দিকগুলোকেও স্বীকার করার সাহস দেখায়। স্মৃতি তখন প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি থেকে রক্ষার একটি নৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন