মুসলিমবিশ্ব পিছিয়ে কেন?

পড়তে ১ মিনিট
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

বিশ্বে প্রায় ৫৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ-যাদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি আফ্রিকা থেকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের প্রান্ত পর্যন্ত। জনসংখ্যা প্রায় ১.৯ বিলিয়ন, যা বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। প্রাকৃতিক সম্পদ-বিশেষ করে তেল ও গ্যাস-বিশ্ব অর্থনীতির এক বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে মুসলিম দেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি, আফ্রিকার খনিজ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবসম্পদ- সব মিলিয়ে মুসলিম বিশ্ব এক বিরাট সম্ভাবনার আধার। তাহলে প্রশ্ন জাগে, এত জনশক্তি, সম্পদ ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কেন আজকের বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও সাহিত্য সৃষ্টিতে মুসলিম বিশ্বের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একসময় মুসলিম বিশ্বই ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। আব্বাসীয় যুগে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত House of Wisdom (বায়তুল হিকমাহ) ছিল বিশ্বের প্রথম সারির গবেষণা ও অনুবাদ কেন্দ্র। খলিফা আল মামুনের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডার অনুবাদ ও উন্নয়ন করা হয়। এই জ্ঞানভিত্তিক আন্দোলন থেকে উঠে আসেন অসংখ্য মনীষী- ইবনে সিনা, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যার Canon of Medicine শতাব্দীর পর শতাব্দী ইউরোপে পাঠ্য ছিল। আল খাওয়ারিজমি যার হাত ধরে বীজগণিত (Algebra) একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রে পরিণত হয়। আল ফারাবির, দর্শন ও রাজনৈতিক চিন্তায় যিনি গভীর প্রভাব ফেলেন। এই জ্ঞানধারা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আজকের মুসলিম বিশ্বের চিত্র আশানুরূপ নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান বিষয়টি স্পষ্ট করে। গবেষণা ও উন্নয়নে মুসলিম দেশগুলোর গড় ব্যয় জিডিপির ০.৫ শতাংশেরও কম, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে ২ থেকে ৪ শতাংশ বা তার বেশি। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় মুসলিম দেশগুলোর উপস্থিতি খুবই সীমিত। বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশনায় মুসলিম দেশগুলোর অবদান প্রায় ৮-১০ শতাংশ, যা তার জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম। সম্পদের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান-গবেষণা ও উৎপাদনে পিছিয়ে পড়া একটি বাস্তবতা। এই পশ্চাৎপদতার কারণ একক নয়; বরং তা জটিল ও বহুমাত্রিক। অনেক দেশে এখনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষা প্রচলিত, যেখানে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও গবেষণার সুযোগ কম। ফলে শিক্ষিত জনশক্তি তৈরি হলেও তারা উদ্ভাবক হয়ে উঠতে পারে না। প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বিপুল আয় সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কম।

তেলনির্ভর অর্থনীতি গবেষণা-উদ্ভাবনের বিকল্প হতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলে যুদ্ধ, সঙ্ঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থিতিশীলতা ছাড়া গবেষণা ও শিক্ষা বিকশিত হয়না। প্রতিভাবান শিক্ষার্থী ও গবেষকরা উন্নত সুযোগের খোঁজে পশ্চিমা বিশ্বে চলে যাচ্ছে এবং সেখানেই স্থায়ী হচ্ছে। ফলে নিজস্ব জ্ঞানভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক দেশে মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা ও গবেষণার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক রাষ্ট্রে সামরিক বা অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দেয়া হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞান খাত তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকে।

তাহলে অভাবটা কোথায়? মূল সমস্যা হলো- দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, কার্যকর নীতির অভাব, জ্ঞানকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার অভাব। উদ্যম থাকলেও তা সঠিক কাঠামো ও পরিবেশের অভাবে বাস্তব রূপ পায় না। মুসলিম বিশ্ব যদি আবার জ্ঞান-বিজ্ঞানের নেতৃত্বে ফিরতে চায়, তবে কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা থেকে বেরিয়ে বিশ্লেষণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে। গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। জিডিপির কমপক্ষে ২ শতাংশ গবেষণা খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আধুনিক জ্ঞানকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। নতুন যুগের House of Wisdom প্রতিষ্ঠা- যেখানে বিশ্বমানের গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা হবে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যৌথ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রকল্প ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়াতে হবে। মেধা ধরে রাখা ও আকর্ষণ করার জন্য গবেষকদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করে brain gain তৈরি করতে হবে। জ্ঞানচর্চার জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা অপরিহার্য।

মুসলিম বিশ্ব একসময় ছিল জ্ঞানের আলোকবর্তিকা, আজও সেই সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়নি। সম্পদ, জনশক্তি ও ঐতিহ্য- সবই বিদ্যমান। প্রয়োজন কেবল সঠিক দিকনির্দেশনা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেয়ার মানসিকতা। যদি আব্বাসীয় যুগের মতো আবার জ্ঞানকে কেন্দ্র করে সভ্যতা গড়ে তোলা যায়, তবে মুসলিম বিশ্ব পুনরায় বৈশ্বিক জ্ঞান-সভ্যতার নেতৃত্বে ফিরে আসতে পারে। প্রশ্নটি তাই আর সম্ভাবনার নয়- প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই পথ বেছে নিতে প্রস্তুত? প্রশ্নটি সরল মনে হলেও এর ভেতরে রয়েছে ইতিহাস, নেতৃত্ব, রাষ্ট্রচিন্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি গভীর বাস্তবতা। সংক্ষেপে বললে কেবল আল-মামুন, তৃতীয় আবদুর রহমান বা হাকামের মতো ব্যক্তির অভাবই মূল সমস্যা নয়; বরং সেই ধরনের নেতৃত্বকে ধারণ ও টিকিয়ে রাখার পরিবেশের অভাবই বড় সংকট।

আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন শুধু একজন শাসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন জ্ঞানপিপাসু রাষ্ট্রনায়ক। তার পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র গড়ে উঠে। অন্যদিকে স্পেনে তৃতীয় আবদুর রহমান একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলেন, যা ইউরোপের মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তার উত্তরসূরি দ্বিতীয় আল হাকাম ছিলেন বইপ্রেমী শাসক-কথিত আছে, তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে লক্ষাধিক বই ছিল। এই তিনজনের মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট: তারা জ্ঞানকে ক্ষমতার অলঙ্কার নয়, রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন। তাহলে আজ কেন এমন নেতৃত্ব বিরল? আজকের বিশ্বে প্রতিভাবান, দূরদর্শী মানুষ নেই- এ কথা সত্য নয়। মুসলিম বিশ্বে এখনো অসংখ্য মেধাবী চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারক রয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো- তাদের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। আল-মামুন বা আবদুর রহমানের সময় রাষ্ট্রের মর্যাদা নির্ধারিত হতো জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার উৎকর্ষ দিয়ে। আজ অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার চলে গেছে- ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাহ্যিক সূচকে। ফলে জ্ঞানচর্চা মূল অ্যাজেন্ডা থেকে সরে গেছে। ঐতিহাসিক সেই শাসকরা শতাব্দীকে সামনে রেখে পরিকল্পনা করতেন। আজকের অনেক নেতৃত্ব স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভে বেশি মনোযোগী- যেখানে গবেষণা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিনিয়োগের ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না।

ইতিহাসে দেখা যায়, আল-মামুন বিভিন্ন ধর্ম ও মতের পণ্ডিতদের একত্র করেছিলেন। আজ অনেক জায়গায় মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা জ্ঞানচর্চাকে সঙ্কুচিত করে ফেলছে। তাহলে কি মুসলিম বিশ্বে আজ আল-মামুন বা আবদুর রহমানের মতো মানুষ নেই? বাস্তবতা হলো- মানুষের অভাব নয়, সেই মানুষদের উঠে আসার পরিবেশের অভাব।

ইতিহাস আমাদের শেখায়- একজন আল-মামুন একটি যুগের সূচনা করতে পারেন; কিন্তু সেই যুগকে টিকিয়ে রাখে একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা। আজ মুসলিম বিশ্বের সামনে চ্যালেঞ্জটি তাই দ্বিমুখী; নতুন আলোকিত নেতৃত্ব সৃষ্টি করা এবং সেই নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।

প্রশ্ন থাকতে পারে- মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক চিত্রে যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ করা যায়, তখন একই পরিসরে সেখানে তুরস্ক ও ইরান কীভাবে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে যেতে পারল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা কাঠামো এবং আত্মনির্ভরতার মানসিকতা- সবকিছু একসাথে বিশ্লেষণ করতে হবে। তুরস্ক ও ইরান- উভয় দেশেরই রয়েছে দীর্ঘ সভ্যতার ঐতিহ্য এবং শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়। ইরান প্রাচীন পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করে, যেখানে জ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য চর্চার ঐতিহ্য হাজার বছরের। অন্যদিকে তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি হিসেবে একটি সুগঠিত প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পেয়েছে। এই ঐতিহ্য তাদের রাষ্ট্রচিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। নিজস্ব সক্ষমতা ও জ্ঞানচর্চাকে জাতীয় শক্তির অংশ হিসেবে দেখেছে। দুটি দেশই তুলনামূলকভাবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে।

তুরস্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ইরান, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আজ ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা-প্রকাশনা উৎপাদক দেশগুলোর একটি। বিশেষ করে প্রকৌশল, চিকিৎসা ও ন্যানো-টেকনোলজিতে তাদের দৃশ্যমান অগ্রগতি রয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নিষেধাজ্ঞা তাদেরকে বাধ্য করেছে আত্মনির্ভর হতে। পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে তারা নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবনে জোর দিয়েছে। অন্যদিকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, ড্রোন প্রযুক্তি, অটোমোবাইল ও অবকাঠামো উন্নয়নে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। তাদের ড্রোন প্রযুক্তি আজ বৈশ্বিকভাবে আলোচিত। এই দুই দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় যে- তাদের নীতির ধারাবাহিকতা বিদ্যমান রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও শিক্ষা, প্রযুক্তি ও শিল্প উন্নয়নের মৌলিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ রয়েছে। তুরস্ক ও ইরান উভয় দেশেই নিজস্ব ভাষায় সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার একটি শক্তিশালী ধারা বজায় রয়েছে। এতে জ্ঞানচর্চা শুধু এলিট শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়।

তুরস্ক ও ইরান উভয় দেশই গবেষণাকে শিল্পের সাথে যুক্ত করতে পেরেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা বের হয়ে শিল্প খাতে প্রয়োগ হচ্ছে। স্টার্টআপ, প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো গবেষণার ফল ব্যবহার করছে। এই সংযোগই তাদের অগ্রগতিকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। তবে এটিও সত্য যে, এই দুই দেশ এখনো পশ্চিমা বিশ্বের সমতুল্য নয়। তাদের সামনে রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা। তবুও তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে- সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

অন্য মুসলিম দেশগুলো কেন পারছে না? তুলনামূলকভাবে অনেক মুসলিম দেশে দেখা যায়- তেলনির্ভর অর্থনীতি, যেখানে জ্ঞানভিত্তিক বিনিয়োগ কম, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। ফলে সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তা জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে না। মুসলিম বিশ্বের পতনের সূচনা কোনো একক কারণে হয়নি। রাজনৈতিক ভাঙন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বহিরাগত আক্রমণ এবং বৈশ্বিক শক্তির পরিবর্তন- সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা তৈরি হয়। যে ধারায় জ্ঞানচর্চা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হচ্ছিল, তা একসময় থমকে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ইউরোপে রেনেসাঁ, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে নতুন এক জ্ঞানসভ্যতার উত্থান ঘটে। ফলে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয়।

মুসলিম বিশ্বের পিছিয়ে পড়া কোনো স্থায়ী নিয়তি নয়; এটি একটি সময়িক বাস্তবতা। পিছিয়ে পড়ার কারণ একদিনে তৈরি হয়নি- উত্তরণও একদিনে হবে না। কিন্তু পথ পরিষ্কার; জ্ঞানকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা, সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ বাড়ানো, স্বাধীন-সৃজনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। ইতিহাস আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা রেখে গেছে- যে জাতি জ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়, সেই জাতিই সভ্যতার নেতৃত্ব দেয়। আজ মুসলিম বিশ্বের সামনে তাই এক নতুন আহ্বান- আবার জ্ঞানের পথে ফিরে আসা, আবার নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখা। ‘পিছিয়ে থাকা’ স্থায়ী পরিচয় নয়; বরং এটি হবে একটি অস্থায়ী অধ্যায়, যার পরেই শুরু হতে পারে নতুন উত্থানের গল্প।


লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার।

drkhalid09@gmail.com

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন