মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের পরিধি বাড়াতে চায় তুরস্ক

পড়তে ১ মিনিট

ইসলামাবাদে প্রদর্শিত বিলবোর্ডে মোহাম্মদ বিন সালমান, শাহবাজ শরিফ, রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের ছবি।- ইপিএ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতার মধ্যে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে মিসরসহ আরও কয়েকটি দেশ এই জোটে যুক্ত হতে পারে।

শনিবার রাতে বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মূলত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি। এর লক্ষ্য কোনো দেশকে আক্রমণ করা নয়; বরং সদস্য দেশগুলোর যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, পরবর্তী ধাপে মিসরও আমাদের এই জোটে থাকবে। আমরা ইতোমধ্যেই একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করি, যেন আমরা জোটের সদস্য।’

মিসরের যোগদানের বিষয়ে কিছু কারিগরি বিষয় রয়েছে উল্লেখ করে ফিদান বলেন, সেগুলো সমাধান হয়ে গেলে দেশটির এই জোটে যুক্ত না হওয়ার আর কোনো কারণ থাকবে না।

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সম্মিলিতভাবে এর জবাব দেওয়া হবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, চুক্তিটির মূল উদ্দেশ্য হলো যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।

তবে চুক্তিটি ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে—এমন দাবি নাকচ করে ফিদান বলেন, চুক্তিতে কোনো সাধারণ হুমকি বা নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমরা চুক্তিতে লিখিতভাবে কোনো সাধারণ হুমকির কথা উল্লেখ করিনি।’

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও ফিদান জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই এর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, তুরস্ক আগে থেকেই ধারণা করেছিল যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হতে পারে এবং নতুন ধরনের নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।

ফিদান বলেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান কোনো সম্প্রসারণবাদী দেশ নয়। তারা নিজেদের সীমান্ত, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই তিন দেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কাঠামোটি স্বভাবতই প্রতিরক্ষামূলক।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন যখন এই দেশগুলোর সঙ্গে একজোট হয়েছি, স্বাভাবিকভাবেই আমরা একটি প্রতিরক্ষা-কেন্দ্রিক সংস্থায় পরিণত হচ্ছি। এটি আক্রমণাত্মক কোনো উদ্যোগ নয়।’

ফিদান আরও বলেন, এই জোট কোনো আঞ্চলিক বা বহিরাগত দেশকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়নি। বরং সদস্য দেশগুলোর ওপর হামলা হলে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য।

তিনি ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই জোট কেবল তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে অন্যান্য দেশকেও এর আওতায় আনা যেতে পারে।

ফিদান বলেন, ‘আমাদের প্রেসিডেন্টের দূরদর্শী ভাবনার অধীনে, আমাদের কেবল তিনটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমাদের পরিধি বাড়ানো উচিত এবং প্রয়োজনে সব দেশকে এই ছাতার নিচে আনা উচিত।’

তিনি জানান, মক্কা চুক্তির প্রস্তুতিতে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে। এ সময়ে শুধু স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর সঙ্গেই নয়, অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানও বিভিন্ন আঞ্চলিক নেতার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ফিদানের ভাষ্য, যৌথ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে মক্কা চুক্তির কাঠামো ন্যাটো সনদের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে তুরস্ক ন্যাটোসহ বিদ্যমান জোটগুলোর প্রতি তার প্রতিশ্রুতিও বজায় রাখবে।

তিনি বলেন, তুরস্কের লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতা ও মালিকানা বাড়ানো। তাঁর মতে, বাইরের শক্তি এসে কোনো অঞ্চলের সমস্যা সমাধান করলে অনেক সময় তা আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাই আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ফিদান দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমন্বয়ের জন্য নিরাপত্তা ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ইউরোপে ধীরে ধীরে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমন্বয় গড়ে উঠেছিল। তুরস্কও মধ্যপ্রাচ্যে একই ধরনের একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সমস্যা হলো যুদ্ধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাত। তাই এই অঞ্চলে প্রথমে একটি নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে এর ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সমন্বয় আরও গভীর করা সম্ভব।

ককেশাস ও মধ্য এশিয়াতেও একই ধরনের কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান ফিদান। তবে তিনি বলেন, অঞ্চলভেদে অগ্রাধিকার ভিন্ন হতে পারে। কোথাও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আবার কোথাও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বেশি।

তুরস্ক কোনো আধিপত্যবাদী নীতি অনুসরণ করছে না উল্লেখ করে ফিদান বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়েই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ককেশাসে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকেও তুরস্ক সমর্থন করছে বলে জানান তিনি।

‘মুসলিম ন্যাটো’ প্রসঙ্গ

মক্কা চুক্তিকে তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন এরবাকানের ‘মুসলিম ন্যাটো’ ধারণার বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছে কিছু তুর্কি গণমাধ্যম। এরবাকান ছিলেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের রাজনৈতিক গুরু। তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার পক্ষে ছিলেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর আদলে মুসলিম দেশগুলোর একটি যৌথ কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

এদিকে এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন একে পার্টির জোটসঙ্গী ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টির নেতা দেভলেত বাহচেলিও গত কয়েক বছর ধরে একটি আঞ্চলিক ইসলামিক নিরাপত্তা জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়ে আসছেন।

২০২৪ সালের আগস্টে তিনি তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, মিসরসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিয়ে ‘জেরুজালেম চুক্তি’ গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, গাজায় ইসরাইলি হামলা বন্ধ, আল-আকসা মসজিদ রক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের একটি আঞ্চলিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে তুরস্ক শুধু একটি সামরিক সমঝোতা হিসেবে দেখছে না; বরং এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি বৃহত্তর কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছে। তবে এই উদ্যোগ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বাস্তবায়নে সময় লাগবে বলেও জানিয়েছেন ফিদান।


সূত্র : ডেইলি সাবাহ

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন