দুর্বল বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা : বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমাল বাংলাদেশ ব্যাংক
লেখক:
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতি বিবৃতিতে (এমপিএস) বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬.৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৫ শতাংশে, যা গত অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৮.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। এমন বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার তুলনামূলক রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) প্রকাশিত মুদ্রানীতি বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের চাপ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে একটি ‘ভঙ্গুর পুনরুদ্ধার’ (fragile recovery) পর্যায় অতিক্রম করছে।
কেন কমানো হলো বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি একটি দেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান সূচক। সাধারণত শিল্প, ব্যবসা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে ঋণের চাহিদাও বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে গত দুই বছরে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩-১৪ শতাংশের ঘরে, সেখানে তা ধাপে ধাপে কমে ২০২৫ সালের মে মাসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ শতাংশে। এটি গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্ন প্রবৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করছে—
১. উচ্চ সুদের হার ও কঠোর মুদ্রানীতি;
২. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান;
৩. ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ব্যাপক বৃদ্ধি;
৪. জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি;
৫. ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি;
৬. বেসরকারি খাতের পরিবর্তে সরকারের উচ্চমাত্রার ঋণ গ্রহণ।
৭. সুদের হার অপরিবর্তিত, ফিরছে ৪ শতাংশ স্প্রেড সীমা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বর্তমান নীতি সুদহার (Policy Rate) অপরিবর্তিত রাখা হবে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (Interest Rate Spread) সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পুনরায় কার্যকর করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নর বলেন, ‘বর্তমান নীতি সুদহার বজায় থাকবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো যাতে অতিরিক্ত সুদ আরোপ করতে না পারে, সেজন্য ৪ শতাংশ স্প্রেড সীমা পুনর্বহাল করা হচ্ছে।’
তবে ব্যাংকারদের একাংশের মতে, বাজারভিত্তিক সুদের হার ব্যবস্থায় পুনরায় স্প্রেড সীমা আরোপ ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ব্যাংকগুলো কেন ঋণ দিতে আগ্রহ হারাচ্ছে?
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলো বর্তমানে নতুন ঋণ বিতরণে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। একইসঙ্গে সরকারের উচ্চমাত্রার ঋণ গ্রহণের কারণে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি ‘Crowding Out Effect’ নামে পরিচিত, যেখানে সরকারি ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও পুনঃতফসিলকৃত ঋণের চাপ থাকায় অনেক ব্যাংক মূলধন সংকটেও পড়েছে, যা নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব : মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউক্রেন
বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও সার সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে আমদানি ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে—
কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ; মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত; বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা—বাংলাদেশের উৎপাদন খাত, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (CMSME) খাতকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারেনি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বনাম প্রবৃদ্ধি : দ্বৈত চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ব্যাংক
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে একটি কঠিন নীতিগত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামেনি, অন্যদিকে অতিরিক্ত কঠোর মুদ্রানীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও মন্থর করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, আর্থিক খাত সংস্কার এবং লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার হবে। তবে জ্বালানি সংকট, কাঠামোগত মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক অনিশ্চয়তাকে এখনো অর্থনীতির জন্য প্রধান ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণ : অর্থনীতির জন্য কী বার্তা দিলো নতুন মুদ্রানীতি?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি মূলত তিনটি বার্তা দিচ্ছে—
প্রথমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বীকার করছে যে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতির।
দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে এখনো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যদিও এর ফলে স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি ছাড়া শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করা সম্ভব হবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী ছয় মাসে বেসরকারি বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ অর্থনীতি কত দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে ফিরতে পারবে।



