পাহাড় থেকে সমুদ্র: পার্বত্য চট্টগ্রাম–কক্সবাজারে বাংলাদেশের রেয়ার আর্থের অদৃশ্য ভাণ্ডার?

পড়তে ১ মিনিট

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার | ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট (REE) বা বিরল মৃত্তিকা মৌলের সম্ভাবনায় দুটি ভিন্ন ভূতাত্ত্বিক উৎস সামনে আসে—পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত সম্ভাব্য উৎস-অঞ্চল (source-rock), আর কক্সবাজার–টেকনাফ–মহেশখালী উপকূল হলো ইতোমধ্যে শনাক্ত প্লাসার বা ভারী খনিজ ঘনীভবন অঞ্চল (placer/heavy-mineral concentration zone)।

১. কক্সবাজার: সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণভিত্তিক সম্ভাবনা

কক্সবাজার–টেকনাফ–মহেশখালী উপকূলের বালিতে মোনাজাইট (monazite), জেনোটাইম (xenotime), জিরকন (zircon), ইলমেনাইট (ilmenite) ও রুটাইলসহ (rutile) বিভিন্ন ভারী খনিজের উপস্থিতি প্রমাণিত। এর মধ্যে মোনাজাইট হলো রেয়ার আর্থ এলিমেন্টের প্রধান বাহক; বিশেষ করে এতে সিরাম (Ce), ল্যানথানাম (La), নিওডিমিয়াম (Nd) এবং কিছু পরিমাণে প্রাসেওডিমিয়াম ও সামারিয়াম থাকে। ২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের উপকূলীয় বালিতে মোট ভারী খনিজের পরিমাণ (heavy-mineral content) প্রায় ১–৩০ শতাংশ এবং এর ৫–১৫ শতাংশ রেয়ার আর্থ বহনকারী খনিজ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ করে কক্সবাজার–টেকনাফ উপকূলের প্রায় ১২০ কিলোমিটারজুড়ে ভারী খনিজের প্লাসার দীর্ঘদিন ধরে নথিভুক্ত রয়েছে। গবেষণায় ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, রুটাইল, জিরকন ও মোনাজাইট শনাক্ত হয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, পরীক্ষাগারে কক্সবাজারের বালিতে সিরাম, ল্যানথানাম, প্রাসেওডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, ইট্রিয়াম, ইটারবিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম ও আরবিয়ামের মতো একাধিক বিরল মৃত্তিকা মৌল নিশ্চিত করা গেছে।

২. মহেশখালী–কুতুবদিয়া: নতুন গুরুত্বের উপকূল

মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার সাম্প্রতিক সৈকত-অবক্ষেপণ (beach-deposition) নিয়ে গবেষণায় রেয়ার আর্থ এলিমেন্টের উপস্থিতি পরিমাপ করা হয়েছে (ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইকোনমিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল জিওলজি)। সোনাদিয়া দ্বীপের গবেষণায় মোনাজাইট ও জিরকনের মতো রেয়ার আর্থ-সমৃদ্ধ খনিজ শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এগুলোর উৎস হতে পারে চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ফোল্ডেড বেল্ট এবং বৃহত্তর হিমালয়-উৎসীয় পলি ব্যবস্থা (স্প্রিঙ্গার)। অর্থাৎ কক্সবাজার উপকূলের গুরুত্ব কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বালিয়াড়ি হিসেবে নয়; এটি বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় পলি-প্লাসার ব্যবস্থার (Bay of Bengal sedimentary–placer system) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৩. পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন চিত্র

পার্বত্য চট্টগ্রামে কক্সবাজারের মতো বাণিজ্যিক রেয়ার আর্থ মজুত ইতোমধ্যে প্রমাণিত—এমন জোরালো তথ্য নেই। তাই সেখানে সরাসরি ‘রেয়ার আর্থের বিশাল ভাণ্ডার’ ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সতর্কতার দাবি রাখে। তবে ভূতাত্ত্বিকভাবে অঞ্চলটির গুরুত্ব অপরিসীম। কক্সবাজারের ভারী খনিজের উৎস হিসেবে চট্টগ্রাম–আরাকান পাহাড়ি অঞ্চল এবং সংশ্লিষ্ট আগ্নেয় শিলার (felsic/igneous rocks) কথা গবেষণায় উঠে এসেছে।

এর অর্থ হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু আবহাওয়া-ক্ষয়প্রাপ্ত বেডরক (weathered bedrock), স্ট্রিম সেডিমেন্ট, পলল অবক্ষেপ এবং প্লাসার কনসেন্ট্রেশনে রেয়ার আর্থ-বহনকারী খনিজ অনুসন্ধানের যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। বিশেষ করে মোনাজাইট ও জেনোটাইমের উৎস-শিলা শনাক্ত করা গেলে কক্সবাজারের প্লাসার ডিপোজিটের ভূতাত্ত্বিক উৎস আরও স্পষ্ট হবে।

৪. প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কোথায়?

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি:

রেয়ার আর্থের উপস্থিতি ≠ রেয়ার আর্থের মজুত ≠ অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য রিজার্ভ (Reserve)।

কক্সবাজারে রেয়ার আর্থ-বহনকারী খনিজের উপস্থিতি প্রমাণিত হলেও বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো হলো—

কোন এলাকায় ঠিক কত টন মোনাজাইট আছে?

মোনাজাইটে ল্যানথানাম-সিরাম-নিওডিমিয়াম-প্রাসেওডিমিয়ামের প্রকৃত গ্রেড কত?

জেনোটাইমের পরিমাণ এবং ইট্রিয়াম-ডিসপ্রোসিয়াম-টারবিয়ামের গ্রেড কেমন?

বিরল মৃত্তিকা মৌলের পুনরুদ্ধার হার (recovery rate) কত?

মোনাজাইটে থোরিয়াম ও ইউরেনিয়ামের মাত্রা কী পরিমাণ?

উত্তোলন ও রাসায়নিক পৃথকীকরণের (chemical separation) খরচ কেমন পড়বে?

পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা?

বিদ্যমান জিরকন–ইলমেনাইট–রুটাইল উত্তোলনের সঙ্গে রেয়ার আর্থ পুনরুদ্ধার যুক্ত করা সম্ভব কি না?

সাম্প্রতিক গবেষণাও বলছে, বাংলাদেশের মোনাজাইট অনুসন্ধান এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং রিজার্ভ পরিমাপ, খনিজ রসায়ন ও বেনিফিটেশনের ক্ষেত্রে আরও গভীর কাজ প্রয়োজন।

৫. কেন কক্সবাজার হতে পারে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পদ

কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, রেয়ার আর্থকে একক খনি হিসেবে না দেখে একটি বহুমুখী খনিজ সম্পদ (multi-mineral resource) হিসেবে বিবেচনা করা যাবে। একই বালু থেকে সম্ভাব্যভাবে উত্তোলিত হতে পারে—


কক্সবাজারের খনিজবিদ্যা নিয়ে গবেষণায় এসব খনিজের যথেষ্ট উপস্থিতি মিলেছে। এ কারণে বাংলাদেশের জন্য টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হতে পারে: “রেয়ার আর্থ মাইন” নয়, বরং “ইন্টিগ্রেটেড ক্রিটিক্যাল-মিনারেলস রিকভারি সিস্টেম।” এটি অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।

৬. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: থোরিয়াম

মোনাজাইটের সঙ্গে তেজস্ক্রিয় মৌল থোরিয়াম থাকার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কক্সবাজারের বিচ অ্যাকুইফার নিয়ে গবেষণায় মোনাজাইট ও জিরকনে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের সমৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই রেয়ার আর্থ উত্তোলনের প্রকল্প হাতে নিলে শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নয়, বরং রেডিওলজিক্যাল নিরাপত্তা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (tailings management), ভূগর্ভস্থ পানির সুরক্ষা এবং উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি শুরু থেকেই প্রকল্পের মূল শর্ত হিসেবে রাখতে হবে।


৭. অনুসন্ধানের অগ্রাধিকার সারণী



একটি বড় জাতীয় সুযোগ

হিমালয় থেকে নেমে আসা পলি এবং চট্টগ্রাম–আরাকান পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া-বর্জিত উপাদান দীর্ঘকাল ধরে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে জমা হয়েছে। এই ভূতাত্ত্বিক বাছাই প্রক্রিয়ার (geological sorting process) ফলে মোনাজাইট, জিরকন, রুটাইল ও ইলমেনাইটের মতো অপেক্ষাকৃত ভারী খনিজ নির্দিষ্ট উপকূলীয় অঞ্চলে ঘনীভূত হয়েছে।

তাই কেবল বিচ্ছিন্নভাবে “কক্সবাজারে রেয়ার আর্থ আছে” না বলে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে একটি সংযুক্ত ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থা (connected geological system) হিসেবে বিবেচনা করে রেয়ার আর্থ অনুসন্ধান করা বাংলাদেশের জন্য অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন