তীব্র হচ্ছে জলবায়ু সংকট: ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত মাস আগস্ট
লেখক:
২০২৪ সালের বিশ্বজুড়ে রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণ মাসগুলোর একটি আগস্ট মাস | ছবি : সংগৃহীত
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস বিশ্বজুড়ে রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণ মাসগুলোর একটি। মাসটিতে স্থল ও সমুদ্রে অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করেছে। একই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল ও পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
আগস্টে বিশ্বব্যাপী গড় বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা ১৬ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এটি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে রেকর্ড হওয়া আগের মাসিক তাপমাত্রার রেকর্ডকে সামান্য ছাড়িয়ে যায়। ব্যবধান ছিল মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য এক ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে কোপার্নিকাসের হিসাবে ২০২৩ সালের জুলাই ও ২০২৪ সালের আগস্ট কার্যত যৌথভাবে রেকর্ড উষ্ণতম মাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই তাপমাত্রার রেকর্ড পৃথিবীর দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে। এর প্রভাবে প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।
কোপার্নিকাসের নির্ভরযোগ্য জলবায়ু তথ্যের ইতিহাস ১৯৪০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে বরফের কোর, গাছের বলয় ও প্রবাল কঙ্কালের মতো প্রাকৃতিক নিদর্শন থেকে আরও প্রাচীন সময়ের জলবায়ু সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বর্তমান তাপমাত্রা গত ১০ হাজার বছরের মানব ইতিহাসের অভিজ্ঞতার তুলনায়ও নজিরবিহীন হতে পারে।
সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আগস্টে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড স্পর্শ করে। কয়েক মাস ধরে চলা অস্বাভাবিক সামুদ্রিক উষ্ণতার ধারাবাহিকতাও বজায় ছিল। গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে আটকে থাকা অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশের বেশি মহাসাগর শোষণ করে নেয়। এতে স্থলভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা কমলেও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, প্রবাল প্রাচীর ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর তৈরি হচ্ছে ব্যাপক চাপ।
ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট ‘এল নিনো’ পরিস্থিতিও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এল নিনো স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর প্রভাবে খরা, বন্যা, দাবানলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হয়ে ২০২৪ বা ২০২৫ সালকে রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর করে তুলতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছিলেন।
ইউরোপ ইতোমধ্যে ভয়াবহ এক গ্রীষ্ম পার করেছে। কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষে পশ্চিম ইউরোপ রেকর্ড করা ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম অতিক্রম করে। এই উষ্ণতা ২০০৩ সালের ভয়াবহ দাবদাহকেও ছাড়িয়ে যায়। একের পর এক তাপপ্রবাহের কারণে বিভিন্ন স্থানে স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে, নদী ও জলাধারের পানির স্তর কমেছে এবং ধ্বংসাত্মক দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রও ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ গ্রীষ্মের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ নজিরবিহীন উচ্চ তাপমাত্রার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, এসব পৃথক তাপমাত্রার রেকর্ড আসলে বৃহত্তর একটি পরিবেশগত পরিবর্তনের অংশ। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব যত বাড়বে, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোও তত বেশি ঘন ঘন ঘটতে পারে। আগস্টের এই তাপমাত্রার রেকর্ড তাই শুধু একটি মাসের উষ্ণতার খবর নয়, বরং দ্রুত পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।


