জবাবদিহিহীন মানবাধিকার : কাশ্মির এবং বিশ্ববিবেকের ব্যর্থতা
জবাবদিহিহীন মানবাধিকার : কাশ্মির এবং বিশ্ববিবেকের ব্যর্থতা
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এ প্রশ্ন তুলেছিলেন, “পৃথিবী যখন অশান্তিতে জ্বলছে, সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ছে আর মানবাধিকার পদদলিত হচ্ছেÑতখন কোথায় সেই জাতিসঙ্ঘ?”
জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এ বলেন, “শান্তি আজ অবরুদ্ধ। সঙ্ঘাত বাড়ছেই, সাধারণ মানুষ চরম কষ্ট পাচ্ছে। মানবাধিকার আর আন্তর্জাতিক আইনগুলো আজ বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে।”
জাতিসঙ্ঘের সাবেক মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, “মানবাধিকারের মর্যাদা কমে যাওয়া মানেই একটি বিশ্ব ক্রমশ অন্ধকারের অতীতে ফিরে যাওয়া।” এই কঠিন সত্যটি এক রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে: বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষার এত ঘোষণা আর অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও, পৃথিবীর অনেক জায়গায় এই সুরক্ষা ব্যবস্থা আজও অত্যন্ত নড়বড়ে।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে রাষ্ট্রদূত ভলকান বোজকির কথা দিয়েছিলেন যে, অসহায় আর নিপীড়িত মানুষেরা যেন এই বিশ্বাস রাখে যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই গণতান্ত্রিক মঞ্চে তাদের কথা শোনা হবে। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, বিশ্ব রাজনীতি আজও আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার দাপটেই বেশি চলেÑযার ফলে অসহায় মানুষগুলো কোনো প্রকৃত অভিভাবক পাচ্ছে না।
বিশ্বের এই দ্বিমুখী আচরণ ভারতের দখলকৃত কাশ্মিরের চেয়ে স্পষ্ট আর কোথাও নেই। সেখানে আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতার সুযোগ নিয়ে এক কোটি ২০ লাখেরও বেশি সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার জুলুম চালানো হচ্ছে।
মানবাধিকার ঘোষণার ৭৭ বছর : প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
বিশ্ব যখন মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ৭৭তম বার্ষিকী পালন করছে, তখনো এর মূল আদর্শÑসাম্য, স্বাধীনতা আর মর্যাদাÑসারা বিশ্বে সমানভাবে সমাদৃত। এই আদর্শ ধর্ম, জাতি বা মতাদর্শের ঊর্ধ্বে। মানুষের সম্মান যখন সঙ্কটে পড়ে, তখন পৃথিবীর সব মানুষই এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু এখানে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে: ইতিহাসে আগে কখনো এত ঘটা করে মানুষের অধিকারের কথা ঘোষণা করা হয়নি, আবার একইসাথে এত নিষ্ঠুরভাবে তা লঙঘনও করা হয়নি।
সারা বিশ্ব আজ সঙ্কটে জর্জরিত :
● মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর অমানবিক নিপীড়ন
● সিরিয়ায় নির্বিচার গণহত্যা এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়া
● ইয়েমেনের চরম মানবিক বিপর্যয়
● ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার কেড়ে নেয়া
● ৯ লাখ ভারতীয় সেনার বুটের নিচে কাশ্মিরিদের অবরুদ্ধ জীবন
এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যর্থতা নয়Ñবরং নৈতিক দায়বদ্ধতার এক চরম বিপর্যয়।
বিশ্বজুড়ে এর প্রতিবাদগুলোও দেখা যায় খুব বিক্ষিপ্ত আর বেছে বেছে; যা অনেক সময় মানবিক প্রয়োজনে না হয়ে বরং রাজনৈতিক স্বার্থে করা হয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিশ্ববাসী রাজনীতি ভুলে সব জায়গায় গুরুতর নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা গ্রহণ করবেÑততক্ষণ মানবাধিকার রক্ষার এই চেষ্টাগুলো বৈষম্যমূলক এবং অন্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।
জাতিসঙ্ঘের না রাখা প্রতিশ্রুতি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেই লক্ষ্যেই জাতিসঙ্ঘ তৈরি হয়েছিল। তাই যেকোনো সঙ্ঘাত থামানো বা তার সমাধান করাই ছিল এর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
কিন্তু এই মূল দায়িত্ব পালনের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, জাতিসঙ্ঘের অর্জন খুবই হতাশাজনক। বসনিয়া, রুয়ান্ডা কিংবা সিরিয়াÑযখনই বড় কোনো বিপর্যয় এসেছে, জাতিসঙ্ঘ বেশিভাগ সময় কেবল দর্শকের মতো হাত গুটিয়ে বসে ছিল। প্রতিবারই সময়মতো ব্যবস্থা না নেয়ায় ঝরে গেছে অসংখ্য নিরপরাধ প্রাণ। আজ কাশ্মিরের বেলাতেও সেই একই দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাচ্ছি।
কাশ্মির : এক অমীমাংসিত বিবাদ ও অবহেলিত জনপদ
জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের আলোচ্যসূচিতে থাকা অন্যতম পুরনো ও অমীমাংসিত সমস্যা হলো কাশ্মির। ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘে তদারকিতে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ গণভোটের ব্যাপারে একমত হয়েছিল, যাতে কাশ্মিরিরা নিজেরাই তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। কাশ্মিরের মানুষ কখনোই স্বেচ্ছায় ভারতের সাথে যোগ দেবে নাÑএটি বুঝতে পেরে দিল্লির সরকার নানা অজুহাতে সেই ভোট বন্ধ করে দেয়। জাতিসঙ্ঘ এখনো কাশ্মিরকে একটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তাদের প্রস্তাবগুলো আজও বাস্তবায়িত হয়নি। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে বড় বড় প্রতিশ্রুতিও কতটা অসহায় হয়ে পড়ে।
এদিকে, কাশ্মিরিরা এক বিভীষিকাময় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, যেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হলো :
● বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
● গুম বা বলপ্রয়োগপূর্বক নিখোঁজ করা
● পরিকল্পিত নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতা
● গণহারে উদ্দেশ্যমূলক আটক বা গ্রেফতার
● সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ এবং ভিন্নমত দমন
জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবিত সমাধানগুলোর পক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলাকেও এখন সেখানে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্ববাসীর নজর এড়াতে ভারত সরকার বিদেশী গণমাধ্যমগুলোকে সেখানে নিষিদ্ধ করেছে এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)’ সতর্ক করে দিয়েছে যে, কাশ্মিরে স্বাধীন সাংবাদিকতা আজ বিলুপ্তির পথে। আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণ না থাকায় এই সংকট আজ তাদের চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে, যারা হয়তো এটি জানলে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতো।
পারমাণবিক বিস্ফোরণোন্মুখ কেন্দ্র : যা বিশ্ব উপেক্ষা করতে পারে না
এই নীরবতা মারাত্মক ঝুঁকি বয়ে আনছে। কাশ্মির আজ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত এবং পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় থাকা এক চরম অস্থির অঞ্চল। ভারত ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে তিনটি বড় যুদ্ধে লড়েছে এবং প্রায় চতুর্থ একটি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছেÑযার প্রতিবারই ছিল পারমাণবিক সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ার গভীর আশঙ্কা।
সীমানা ছাড়িয়ে মানবিক বিপর্যয়ের এমন বড় ঝুঁকি আর কোনো সঙ্ঘাত তৈরি করে না। আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে কাশ্মীরিদের কেবল দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা এমন এক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যা সইবার ক্ষমতা মানবতার নেই। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়: আগ্রাসনকে প্রশ্রয় দেওয়া মানেই শান্তি নয়। ১৯৩৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়া এই কঠিন শিক্ষা পেয়েছিলÑবিশ্ব যেন কাশ্মিরের ক্ষেত্রে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে।
আত্মনিয়ন্ত্রণ : শান্তির এক পরীক্ষিত পথ
আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের চর্চা অনেক দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাতের সমাধান করেছে :
● নামিবিয়া
● পূর্ব তিমুর
● ইরিত্রিয়া
● কসোভো
● মন্টিনিগ্রো
● দক্ষিণ সুদান
এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশগুলো নিপীড়নমূলক শাসনের শিকার ছিল এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তারা সঠিক পথ খুঁজে পেয়েছে। কাশ্মিরও ন্যায়বিচার, স্থিতিশীলতা এবং মর্যাদা পাওয়ার জন্য সেই একই পথের দাবিদার।
করণীয় কী
মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র (ইউডিএইচআর) যদি কেবল কাব্যিক শব্দমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য দলিল হিসেবে টিকে থাকতে হয়, তবে জাতিসঙ্ঘকে অবশ্যই সেখানে পদক্ষেপ নিতে হবে যেখানে তাদের নিজস্ব প্রস্তাবগুলো লঙ্ঘিত হচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের যা করা উচিত :
● কাশ্মির বিষয়ক একজন জাতিসঙ্ঘ বিশেষ দূত নিয়োগ করা।
● কাশ্মিরি জনগণÑযারা এই সঙ্কটের প্রধান অংশীদারÑতাদের সব ধরনের আলোচনায় পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
● আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ভারতীয় কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। মানবাধিকার কোনো প্রতীকী পাওনা নয়; এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান যখন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হস্তক্ষেপ করেন এবং একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করেনÑসেই সাথে কাশ্মির সমস্যার সমাধানে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন। সেই উদ্যোগটি প্রমাণ করেছে যে, কূটনীতির মাধ্যমে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। তবে কোনো কূটনৈতিক সুযোগের যদি সঠিক বাস্তবায়ন না হয়, তবে তা কেবল সঙ্কটের সাময়িক বিরতি হিসেবেই থেকে যায়। যদি মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়া সঠিক হয়ে থাকে, তবে তা কার্যকর করার চেষ্টাও অব্যাহত রাখা উচিত।
শেষ কথা
মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের (ইউডিএইচআর) সেই প্রতিশ্রুতি ততক্ষণ পর্যন্ত অন্তঃসারশূন্যই থেকে যাবে, যতক্ষণ বিশ্ববাসী লাখ লাখ কাশ্মিরিকে অধিকারহীন, বিচারহীন এবং কণ্ঠহীন অবস্থায় বেঁচে থাকতে বাধ্য করবে। ‘বিলম্বিত বিচার মানেই বিচারহীনতা’Ñমানবাধিকারের ক্ষেত্রেও এ কথাটি ধ্রুব সত্য। বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করার জন্য আরেকটি ট্র্যাজেডি বা বড় কোনো বিপর্যয়ের অপেক্ষায় থাকা উচিত নয়। কাশ্মিরিরা অন্য সব নিপীড়িত জাতির মতো কেবল তাদের ন্যায্য অধিকারটুকুই চায়Ñআর তা হলো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করার অধিকার। #



