গাজায় ক্ষুধা সংকট কিছুটা কমেছে, সহায়তা কমলে ফের বাড়ার আশঙ্কা
লেখক:
সাহায্যের মাত্রা অব্যাহত না থাকলে বছরের শেষের দিকে তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১৪ লাখেরও বেশি (গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৭%) পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি
গাজায় গত বছর কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ঘোষণার পর মানবিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে লাখ লাখ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছেন। ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, অর্থায়নের ঘাটতি এবং মানবিক সহায়তা কমে গেলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি আবারও ভেস্তে যেতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নকারী বৈশ্বিক সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় ত্রাণ সরবরাহ বেড়েছে এবং যুদ্ধের তীব্রতা কমেছে। এর ফলে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে আইপিসি বলেছে, এই উন্নতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। মানবিক সহায়তা কমে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত আবারও আগের ভয়াবহ অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
আইপিসির হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত গাজার প্রায় ১২ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ, তীব্র খাদ্যসংকটে ছিলেন। তাদের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি ‘ধাপ ৩: সংকট’ বা তার চেয়েও খারাপ পর্যায়ে ছিল। এর মধ্যে ২ লাখ ১২ হাজারের বেশি মানুষ ছিলেন ‘ধাপ ৪: জরুরি’ পর্যায়ে, যা দুর্ভিক্ষের ঠিক আগের ধাপ।
বর্তমান মাত্রায় সহায়তা অব্যাহত না থাকলে বছরের শেষ নাগাদ তীব্র ক্ষুধার মুখে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১৪ লাখেরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ তখন তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।
গত বছরের আগস্টে গাজার কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি চিহ্নিত করা হলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে আইপিসি বলেছে, বেশিরভাগ পরিবারের খাদ্য গ্রহণ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রায় দুই বছরের যুদ্ধ, বারবার বাস্তুচ্যুতি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর গাজার বহু পরিবার এখনো দিনে এক বা দুই বেলা না খেয়ে থাকছে। অনেকে দাতব্য রান্নাঘরের ওপর নির্ভর করছেন, খাবারের জন্য ভিক্ষা করছেন কিংবা যা পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়েই কোনোভাবে দিন কাটাচ্ছেন।
যুদ্ধবিরতির পর মানবিক সহায়তা বাড়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে আইপিসি। তবে সংস্থাটি বলেছে, গাজাজুড়ে এই অগ্রগতি সমান নয় এবং এর বড় অংশই এখনো আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সামান্য পরিমাণে মানবিক সহায়তার প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হলেও সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
শিশুরাই এখনো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তীব্র অপুষ্টির হার কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে নেমে এলেও দীর্ঘদিনের খাদ্যাভাবের কারণে ‘স্টান্টিং’ বা বয়সের তুলনায় শারীরিক বৃদ্ধির ব্যাহত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির কারণে সৃষ্ট এই সমস্যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অনেক শিশু এখনো ক্ষুধার কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়া কিছু শিশু হয়তো আর কখনোই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারবে না।
এদিকে গাজায় পুষ্টি কর্মসূচিগুলোও সংকুচিত হয়ে আসছে বলে জানিয়েছে আইপিসি। অর্থসংকটের কারণে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীদের জন্য পরিচালিত পরিপূরক পুষ্টি কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কমে প্রায় ৬ হাজারে নেমে এসেছে। মানবিক সংস্থাগুলো আর্থিক সংকট এবং গাজায় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তার মুখে থাকায় এই সহায়তা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ত্রাণ সংস্থাগুলো গাজার পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ধ্বংস নিয়েও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অকেজো পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং অতিরিক্ত জনাকীর্ণ আবাসনব্যবস্থার কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
গাজার প্রায় ২১ লাখ বাসিন্দার অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত হয়ে এখনো তাঁবু কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। সেখানে বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক পরিষেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সহায়তা কিছুটা বাড়লেও খাবার এখনো অপ্রতুল এবং অনেকের নাগালের বাইরে। খান ইউনিসের একটি দাতব্য রান্নাঘরের খাবারের ওপর নির্ভরশীল বাস্তুচ্যুত মা রানা আবু বকর বলেন, পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত করুণ। পানি ও খাবারের সংকটের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও আকাশচুম্বী।
তবে গাজায় খাদ্য সরবরাহে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইসরাইল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে তারা গাজায় ১৮ লাখ টনেরও বেশি খাদ্য প্রবেশে সহায়তা করেছে এবং কোনো খাদ্যবাহী চালান আটকানো হচ্ছে না।
গাজায় ত্রাণ সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইসরাইলি সামরিক সংস্থা কোগাট আইপিসির প্রতিবেদনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির দাবি, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্ধারিত প্রয়োজনের তুলনায় গাজায় যে পরিমাণ খাদ্য প্রবেশ করেছে, ইসরাইলের দেওয়া সেই তথ্য প্রতিবেদনে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
ইসরাইলি কর্মকর্তাদের দাবি, গাজায় প্রবেশ করা ত্রাণের পরিমাণ নয়, বরং মূল সমস্যা হলো ভূখণ্ডটির অভ্যন্তরে ত্রাণ বিতরণব্যবস্থা। তারা হামাসের বিরুদ্ধে মানবিক সহায়তা সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ লুটের অভিযোগও করেছে। তবে হামাস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ত্রাণ সংস্থাগুলো ইসরাইলের এই বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, গাজায় প্রবেশ করা খাদ্যের বড় একটি অংশ মানবিক সংস্থার মাধ্যমে নয়, বাণিজ্যিক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে যাচ্ছে। চিকিৎসাকর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, বাজারে পাওয়া খাবার জরুরি খাদ্য সহায়তার মতো পুষ্টিকর নয়। ফলে তীব্র অপুষ্টি থেকে সেরে ওঠা শিশুদের জন্য এটি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
কোগাট অবশ্য স্বীকার করেছে যে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করা মোট সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই বাণিজ্যিক পণ্য। তবে মানবিক সহায়তার তুলনায় বাণিজ্যিক চালানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে।
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলা ও গোলাবর্ষণে ১ হাজার ১৮৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহকারী আইপিসি বলেছে, গাজার সাম্প্রতিক এই সামান্য উন্নতি পুরোপুরি অব্যাহত মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়া প্রদানবিষয়ক পরিচালক রস স্মিথ বলেন, সাম্প্রতিক উন্নতিগুলো দেখিয়েছে ধারাবাহিক মানবিক সহায়তা কতটা কার্যকর হতে পারে। তবে এই সহায়তা বন্ধ বা কমে গেলে অর্জিত অগ্রগতি দ্রুত মুছে যেতে পারে।
তিনি বলেন, গত সাত মাসে গাজায় বিশেষ করে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কারণেই এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে মানবিক সহায়তা প্রবেশের ধারাবাহিক সুযোগ এবং নিয়মিত অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
সূত্র : ডেইলি সাবাহ


