কঙ্গোর ইবোলা প্রতিরোধে ৫টি বড় ঘাটতি, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ

পড়তে ১ মিনিট

ইবোলা প্রাদুর্ভাবে নিহতদের দাফনের সময় একটি কফিন বহন

কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ইবোলা প্রতিরোধ কার্যক্রম এখন আরও বেশি করে স্থানীয় সম্প্রদায় ও গ্রামকেন্দ্রিক করা হচ্ছে। কারণ ভাইরাসটি স্বাস্থ্যকর্মীদের শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে আফ্রিকার শীর্ষ জনস্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি)।

বৃহস্পতিবার সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, কঙ্গোতে ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাব এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার পর ভাইরাসটি তিনটি স্বাস্থ্য অঞ্চল থেকে ছড়িয়ে বর্তমানে ৬০টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে পৌঁছেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এতে ৬ হাজার ২৫০ জন আক্রান্ত এবং ৩ হাজার ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতা, বাস্তুচ্যুতি এবং মানুষের ব্যাপক চলাচলের কারণে আক্রান্তদের শনাক্ত করা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই প্রাদুর্ভাব ইতোমধ্যে পশ্চিম আফ্রিকায় ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের ভয়াবহ ইবোলা মহামারির মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ওই মহামারিতে ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যা এখনো বিশ্বে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব হিসেবে বিবেচিত।

আফ্রিকা সিডিসি জানিয়েছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ওই মহামারির তুলনায় ছয় গুণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ গুণ বেশি।

ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কঙ্গোর প্রতিরোধ কার্যক্রমে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘাটতি রয়েছে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) এক প্রতিবেদনে এসব ঘাটতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধান পাঁচটি ঘাটতি হলো—

স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ব্যবস্থা সীমিত

ইবোলা আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, সতর্কবার্তা তদন্ত করা এবং সংক্রমণের গতিপথ অনুসরণে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার এখনো সীমিত। এটিকে প্রতিরোধ কার্যক্রমের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সংস্থা।

স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণ না হলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ সময় হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন।

আক্রান্তদের শনাক্ত করতে দেরি, রোগের তথ্য জানাতে অনীহা এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততার অভাবে অনেক মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আফ্রিকা সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ইবোলায় মৃতদের অন্তত ৬৩ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে।

আফ্রিকা সিডিসির জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া বিভাগের প্রধান ইয়াপ বুম জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ এখন ‘গ্রামকেন্দ্রিক পদ্ধতি’ গ্রহণ করছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জন এবং সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে ইবোলার প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল ইতুরি প্রদেশ পূর্ব কঙ্গোর বিদ্রোহী সংঘাতেরও অন্যতম কেন্দ্র। ফলে স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনের কাজ আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

ইয়াপ বুম বলেন, “প্রাদুর্ভাবের মাঝখানে সেই আস্থা তৈরি করা বেশ জটিল।”

আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণে ঘাটতি

ইবোলা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও নজরদারিতে রাখার কাজ ছয়টি আক্রান্ত প্রদেশজুড়েই কঠিন হয়ে পড়েছে।

যদিও নজরদারি দলগুলো তালিকাভুক্ত সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ৮১ শতাংশের বিষয়ে অনুসরণ করেছে, তবে এই হার পুরো পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। কারণ এতে শুধু তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন; এখনো যাদের শনাক্ত বা খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারা এই হিসাবের বাইরে।

আফ্রিকা সিডিসির হিসাব অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে শনাক্ত হওয়া আক্রান্তদের প্রত্যেকের সঙ্গে গড়ে ৬০ জনের সংস্পর্শ থাকার ভিত্তিতে প্রায় ৯৭ হাজার ৬০০ জনকে শনাক্ত ও নজরদারিতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত মোট সংখ্যার মাত্র ১৯ শতাংশকে এখন পর্যন্ত খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে।

আরও চিকিৎসা ও আইসোলেশন সক্ষমতা প্রয়োজন

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিকে ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি করা হয়েছিল। বর্তমানে এসব শয্যার ৬৭ শতাংশই ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখানে ৮৬৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আক্রান্ত স্বাস্থ্য অঞ্চলগুলোতে আরও চিকিৎসা ও আইসোলেশন কেন্দ্র এবং শয্যা প্রয়োজন। কারণ এখনো শনাক্ত না হওয়া রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

আক্রান্ত অনেক স্বাস্থ্য অঞ্চল এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখানে বিভিন্ন কারণে রোগীদের শনাক্ত করা বা আক্রান্তের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি স্থানীয় জনগণের অনাস্থা।

ইয়াপ বুম বলেন, কিছু স্বাস্থ্য অঞ্চলে নজরদারি দল কিংবা রোগীদের চিকিৎসার জন্য যাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবেশ করাও সম্ভব হচ্ছে না।

পরীক্ষাগারে রোগ শনাক্তের সক্ষমতা সীমিত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত আক্রান্তদের শনাক্ত এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পরীক্ষাগারে ইবোলা শনাক্তকরণের সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত মাসে জানিয়েছিল, ইতুরি প্রদেশের বেশ কয়েকটি চিকিৎসা ও স্থানান্তরকেন্দ্রে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে সেগুলো ‘পরিপূর্ণ’ হয়ে গেছে। আর দ্বিতীয় সর্বাধিক আক্রান্ত প্রদেশ উত্তর কিভুতে রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।

ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ার একটি ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মী জেনো ক্রিকেইজা বলেন, বিদ্যমান চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর স্বাস্থ্যকর্মীরাও প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, “ইবোলা আমাদের সবাইকে আরও বেশি ক্লান্ত করে দিচ্ছে, কারণ আমরা জানি না এই মহামারি কখন শেষ হবে। এই দুর্ভোগ আমার জন্য অসহনীয়।”

মরদেহ দাফনের ব্যবস্থাপনাতেও ঘাটতি

ইবোলায় মারা যাওয়া ৩ হাজারের বেশি মানুষের মরদেহ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে দাফনের জন্য কর্তৃপক্ষ বিশেষ দল মোতায়েন করেছে। তবে দাফন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও এখনো কিছু ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সংস্থা।

আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ইবোলা ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর পরও তার মরদেহে বিপুল পরিমাণ সক্রিয় ভাইরাস থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইতুরি এবং অন্যান্য আক্রান্ত এলাকায় বেশ কয়েকবার নিরাপদ দাফন কার্যক্রমে নিয়োজিত দলগুলোর ওপর হামলা হয়েছে। অনেক সময় ইবোলায় মৃত স্বজনদের রক্ষা করতে চাওয়া পরিবারের সদস্যরাই এসব হামলা চালিয়েছেন।

এ ছাড়া দাফনের সময় ইবোলায় মৃত ব্যক্তিদের কবরের চারপাশে অনেক মানুষকে জড়ো হতে দেখা যায়। কখনো কখনো তারা কফিন থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে অবস্থান করেন, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন