ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও করণীয়
ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও করণীয়
বিশ্বজুড়ে ইসলামি শিক্ষার বিস্তার এবং জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতায় ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। মধ্যযুগীয় সময়ের ঐতিহাসিক জ্ঞানকেন্দ্র থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়- এই দীর্ঘ যাত্রায় ইসলামি শিক্ষা একটি বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে। ধর্মীয় জ্ঞান, শরিয়াহ, আরবি ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক বিজ্ঞানের সমন্বয়ে আজকের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক নতুন শিক্ষামডেল উপস্থাপন করছে।
ইসলামি শিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি হলো আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় (Al-Ayhar University)। ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে মিসরের কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি এবং ইসলামি শরিয়াহ, ফিকহ ও আরবি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আল-আজহার মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়েছে।
একইভাবে মরক্কোর ইউনিভার্সিটি অফ আল কোয়ারাউইয়িন (University of Al Quaraouiæine) এবং তিউনিসিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ ইজ-জিতুনা (University of Ey-Zitouna) বিশ্বের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান হতো, যা ইসলামের স্বর্ণযুগে জ্ঞানচর্চার বিস্তৃত পরিসরকে নির্দেশ করে।
বর্তমানে সৌদি আরব ইসলামি শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এখানে অবস্থিত মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (Islamic University of Madinah), উম্ম আল-কুরা বিশ্ববিদ্যালয় (Umm al-Qura University) এবং ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (Imam Muhammad ibn Saud Islamic University) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য শরিয়াহ, হাদিস, তাফসির ও আরবি ভাষা শিক্ষায় বিশেষায়িত কোর্স প্রদান করে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এসে অধ্যয়ন করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই পূর্ণ স্কলারশিপ সুবিধা পায়।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও আধুনিক ইসলামি শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। কাতারের কাতার বিশ্ববিদ্যালয় (Qatar University), সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বিশ্ববিদ্যালয় (University of Sharjah) এবং ফিলিস্তিনের গাজা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় (Islamic University of Gaya) ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও সামাজিক বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রার মুহাম্মদিয়াহ বিশ্ববিদ্যালয় (Universitas Muhammadiæah Sumatera Utara) এবং আহমদ দাহলান বিশ্ববিদ্যালয় (Universitas Ahmad Dahlan) আধুনিক ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আফ্রিকা মহাদেশেও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তার লক্ষ্য করা যায়। উগান্ডার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় (Islamic University in Uganda) এবং এবং নাইজারের ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় (Islamic University Niger) আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসি-এর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয় এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত।
মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা উন্নয়নকে লক্ষ্য করে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ১৯৭০-এর দশক থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৭৭ সালে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠিত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়Ñমালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে তিনটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। এই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়।
মালয়েশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া (International Islamic University Malaysia) এবং পাকিস্তানের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ (International Islamic University Islamabad) দ্রুতই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, পরিকল্পিত একাডেমিক কাঠামো এবং বৈশ্বিক সংযোগের কারণে এ দু’টি বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম বিশ্বের ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (Islamic University, Bangladesh) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা জটিলতা ও নীতিগত অসঙ্গতির মুখে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান নির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং বারবার স্থানান্তরের মতো সিদ্ধান্ত এর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। প্রথমদিকে রাজধানীর নিকটবর্তী স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে কুষ্টিয়াকে স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। পরে সামরিক শাসনামলে এটিকে ঢাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকার অদূরে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আবারও তা স্থানান্তর করে কুষ্টিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ধারাবাহিক অস্থিরতা ও নীতিগত বিচ্যুতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ ক্ষুণ্ন হয়। ফলে যেখানে ওআইসি’র সুপারিশে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক পরিসরে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানটি সেই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।
সম্মেলনের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা
ওআইসি’র উদ্যোগের একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল সুপারিশ বাস্তবায়নে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে না পারা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ফলোআপ সম্মেলনে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একটি সমন্বিত শিক্ষা কাঠামোর রূপরেখা প্রণয়ন করা হলেও অধিকাংশ দেশ তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়নি। বাংলাদেশেও সেই সুপারিশ অনুযায়ী একটি সমন্বিত ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ধর্মীয় জ্ঞান, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় অপরিহার্য। একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে:
প্রথমত, সকল শিক্ষার্থীর জন্য নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও নিজ নিজ ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচিতি সম্পর্কিত মৌলিক কোর্স থাকা প্রয়োজন। মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলামি আকিদা, কুরআন-সুন্নাহ পরিচিতি, নবী জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে; অন্যদিকে অমুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প নৈতিকতা ও মানবিক শিক্ষা রাখা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বিশেষায়িত শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত রাখতে হবেÑইসলামি আইন, অর্থনীতি, ইতিহাসের পাশাপাশি আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সাংবাদিকতার মতো বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব পাবে।
তৃতীয়ত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
চতুর্থত, ইন্টারডিসিপ্লিনারি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ক্রেডিটভিত্তিক কোর্স কাঠামো (১৩০-১৬০ ক্রেডিট আওয়ার) অনুসরণ করা যেতে পারে।
উপসংহারে বলা যায়, মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা সংস্কারের যে স্বপ্ন ওআইসি দেখিয়েছিল, তা আংশিক সফল হলেও পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে জনসংখ্যার বড় অংশ মুসলিম, সেখানে একটি সমন্বিত, আধুনিক ও মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক মানের একাডেমিক সংস্কার। #



