‘আলী-বডমার পটেনশিয়াল’ থেকে বিশ্বমঞ্চে: বাঙালি পরমাণু বিজ্ঞানী শমসের আলীর অনন্য যাত্রা

পড়তে ১ মিনিট

আল্লামা প্রফেসর ড. এম. শমসের আলী | ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণু বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও চিন্তাবিদ মরহুম আল্লামা প্রফেসর ড. এম. শমসের আলী ছিলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৩৭ সালে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল যশোরের বসুন্দিয়ায়। তাই বসুন্দিয়ার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন গর্ব, অনুপ্রেরণা ও কৃতিত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে অনন্য অবদান

প্রফেসর ড. এম. শমসের আলীর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর একটি হলো পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা। ১৯৬৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এ. আর. বডমারের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের যৌথ গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত এই তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী ‘আলী-বডমার পটেনশিয়াল’ নামে পরিচিত।

নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষায় এই তত্ত্বের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের পাঠ্যক্রমেও এটি পড়ানো হয়। পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর এই অবদান তাঁকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সমাজে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।

কর্মময় জীবন

প্রফেসর ড. এম. শমসের আলীর কর্মজীবন ছিল বহুমাত্রিক ও সাফল্যে সমৃদ্ধ। বিজ্ঞান ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি দেশের উচ্চশিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭০ সালে তিনি আনবিক শক্তি কমিশনের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০০২ সালে সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব লাভ করেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিজ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জ্ঞানচর্চায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা

বিজ্ঞান, শিক্ষা, গবেষণা ও ইসলামি চিন্তাচর্চায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রফেসর ড. এম. শমসের আলী বিভিন্ন সময়ে বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।

১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘অনারারি প্রফেসর অব ফিজিক্স’ মর্যাদা প্রদান করে। ১৯৭৪ সালে তিনি লাভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হরি প্রসন্ন রায় স্বর্ণপদক’। এছাড়া তিনি মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক, যুক্তরাজ্যের ওয়াল ইনোভেশন ফাউন্ডেশনের সর্বোচ্চ ফেলোশিপ, জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক, মওলানা ভাসানী স্বর্ণপদক এবং ২০০৫ সালে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ স্বর্ণপদক লাভ করেন।

বিজ্ঞান ও ইসলামের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও চিন্তাচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ও ইসলামি চিন্তাবিদদের পক্ষ থেকে তিনি ‘আল্লামা’ উপাধিতেও ভূষিত হন।

বিজ্ঞান ও ইসলাম নিয়ে বহুমাত্রিক চিন্তাচর্চা

প্রফেসর ড. এম. শমসের আলীর চিন্তার পরিধি শুধু পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজ্ঞান, ইসলাম, দর্শন, সংস্কৃতি, সুফিবাদ, গণিত ও সমকালীন নানা বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা ও লেখালেখি করেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আলাউদ্দীন’স রিয়েল ল্যাম্প’ (২০১৩), ‘ইসলাম বিজ্ঞান মেডিটেশন’ (২০১৪), ‘সমসাময়িক কিছু প্রসঙ্গ: ইসলামের আলোকে ভাবনা’ (২০১৫), ‘ইসলাম সাইন্স অ্যান্ড কালচার’ (২০১৭), ‘মেকিং ম্যাথ ফান’ (২০১৮), ‘ভাষার ভিতরে ভাষা’ (২০১৯), ‘বিজ্ঞান, সুফি দর্শন ও রুমী’ (২০২০), ‘ইসলাম অ্যান্ড সাম কনটেম্পোরারি ইস্যুজ’ (২০২০), ‘রিডিসকভার ইসলাম’ (২০২১), ‘ইসলামকে নতুন করে জানুন’ (২০২৩), ‘বিদ্রোহী কবির কথনে বিজ্ঞানের বসতি’ (২০২৪), ‘ইসলাম ও সাম্প্রতিক বিজ্ঞান’ (২০২৫) এবং ‘ইসলাম, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি’ (২০২৫)।

বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্ক, সমকালীন বিশ্ব, ইসলামি দর্শন, সংস্কৃতি এবং মানবজীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাঁর প্রকাশনাগুলো পাঠক ও চিন্তাশীল মহলে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে।

এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান

প্রফেসর ড. এম. শমসের আলী ছিলেন একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণু বিজ্ঞানী, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদ, গবেষক ও চিন্তাবিদ। পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃত গবেষণার পাশাপাশি ইসলাম, দর্শন ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর বহুমাত্রিক চিন্তাচর্চা তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

যশোরের বসুন্দিয়ার এই কৃতী সন্তান তাঁর জ্ঞান, গবেষণা ও সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। তাঁর কর্মময় জীবন ও অবদানের পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে, তাঁকে নিয়ে যতই আলোচনা করা হোক, তাঁর কৃতিত্বের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন যেন শেষ হওয়ার নয়।

২০২৫ সালের ৩ আগস্ট এই বরেণ্য বিজ্ঞানী ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার অঙ্গনে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে তাঁর গবেষণা, জ্ঞানচর্চা, সাহিত্যকর্ম ও চিন্তার উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে। জ্ঞান ও গবেষণার প্রতি তাঁর যে নিষ্ঠা এবং বিজ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে যে সেতুবন্ধন তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখবে।


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন