স্লিমান মনসুর: ফিলিস্তিনের প্রতিরোধের তুলি, বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির অভিভাবক

পড়তে ১ মিনিট

স্লিমান মনসুর

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য শৈল্পিক জীবনের ইতি টেনে ফিলিস্তিনি দৃশ্যশিল্পের অন্যতম পুরোধা স্লিমান মনসুর ৭৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। জীবনভর তিনি তাঁর তুলিকে উৎসর্গ করেছিলেন ফিলিস্তিনকে চিত্রায়ণ এবং এর মাটি, স্মৃতি ও পরিচয়কে নথিবদ্ধ করার কাজে।

মনসুর ছিলেন ফিলিস্তিনি আধুনিক দৃশ্যশিল্প আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। জাতীয় স্মৃতি রক্ষা এবং তা মুছে ফেলা কিংবা বিকৃত করার প্রচেষ্টাকে শিল্পের মাধ্যমে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর সৃষ্ট দৃশ্যকল্পগুলো ফিলিস্তিনি পরিচয় ও প্রতিরোধের চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

১৯৪৭ সালের গ্রীষ্মে, নাকবার (The Nakba) প্রায় এক বছর আগে বীরজাইতে (Birzeit) তাঁর জন্ম। মাত্র চার বছর বয়সেই তিনি পিতৃহারা হন। মা তাঁকে ও তাঁর ভাইবোনদের লালন-পালন করেন। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে বীরজাইত, বেথলেহেম ও বেইত জালার গ্রামীণ পরিবেশে। সেখানেই ফিলিস্তিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে তাঁর গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাটির রঙ, জলপাই গাছ, লেবু ফুল, কৃষকের হাত এবং গ্রামীণ জীবনের দৃশ্যপট পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পের প্রধান উপাদানে পরিণত হয়।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর শৈল্পিক প্রতিভার বিকাশ ঘটতে থাকে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে জাতিসংঘ আয়োজিত একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় তিনি বিজয়ী হন। যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পকলা পড়ার ইচ্ছা থাকলেও ১৯৬৭ সালের জুনের যুদ্ধ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর তিনি জেরুজালেমের ‘বেজালেল একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড ডিজাইন’-এ ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন।

শৈল্পিক রূপকল্প পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনসুর উপলব্ধি করেন, ফিলিস্তিনকে শুধু জলপাই গাছ, লেবু ফুল, ফসল কাটার ঋতু আর নকশা করা পোশাকের এক অপরূপ গ্রাম হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। কারণ এই ভূমির ইতিহাস রক্তপাত, উচ্ছেদ ও দখলের বেদনায় ভারাক্রান্ত। তাই তাঁর শিল্পকর্ম কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য চিত্রায়ণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে আধুনিক ফিলিস্তিনের সংগ্রাম, মর্যাদা ও শিকড়ের প্রতি ভালোবাসার গল্প।

তবে বাস্তবতার এই চরম অন্ধকারের মধ্যেও মনসুর তাঁর ক্যানভাসকে কখনো হতাশার পাত্র হতে দেননি। চরম ট্র্যাজেডির মাঝেও তিনি রোমান্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে সৌন্দর্য ও আশার বার্তা ফুটিয়ে তুলেছেন। এভাবেই তিনি ফিলিস্তিনি শিল্পে ‘প্রতীকী বাস্তববাদ’-এর (Symbolic Realism) অন্যতম অগ্রদূত হয়ে ওঠেন।

‘দ্য ক্যামেল অব হার্ডশিপস’—পিঠে বয়ে চলেছে ফিলিস্তিন

১৯৭৩ সালে, ২৬ বছর বয়সে মনসুর তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য ক্যামেল অব হার্ডশিপস’ (The Camel of Hardships) আঁকেন। চোখের আকৃতিতে গঠিত এই চিত্রে দেখা যায়, প্রথাগত পোশাক পরা একজন বৃদ্ধ ফিলিস্তিনি তাঁর পিঠে জেরুজালেম শহর বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। এটি ফিলিস্তিনিদের কাঁধে পুরো ফিলিস্তিন ও জেরুজালেমের বিশাল বোঝার প্রতীক হিসেবে তাদের যৌথ স্মৃতির গভীরে গেঁথে যায়।

চিত্রকর্মটি শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে এক জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়। বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনিদের ঘরে ঘরে এটি পৌঁছে যায় এবং মনসুরকে ফিলিস্তিনি শিল্পের অন্যতম বিশিষ্ট দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

এর মাধ্যমে মনসুর একটি চিরন্তন সত্য ফুটিয়ে তোলেন—বহু দশক পেরিয়ে গেলেও ফিলিস্তিনিরা তাদের মাতৃভূমির দুঃখ-কষ্টের বোঝা পিঠে বহন করে চলেছে এবং তা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছে।

চিত্রকর্মটির ইতিহাসও বেশ জটিল। ১৯৭৩ সালের মূল সংস্করণটি দীর্ঘদিন নিখোঁজ বলে মনে করা হতো। ২০১৫ সালে ক্রিস্টিস (Christie’s) জানায়, লন্ডনের একজন সংগ্রাহকের কাছে মূল চিত্রকর্মটি সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯৭৬ সালে তিনি দ্বিতীয় একটি সংস্করণ আঁকেন, যা লন্ডনে লিবিয়ার রাষ্ট্রদূত কিনে নিয়ে মুয়াম্মর গাদ্দাফিকে উপহার দেন। ধারণা করা হয়, ১৯৮৬ সালে ত্রিপোলিতে মার্কিন বোমা হামলায় সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। ২০০৫ সালে মনসুর তৃতীয় একটি সংস্করণ তৈরি করেন, যা বৈরুতের রামজি দালুল কালেকশনের অংশ।

তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘ব্রাইড অব দ্য হোমল্যান্ড’, ‘ডটার অব জেরুজালেম’, ‘সাবরা অ্যান্ড শাতিলা’, ‘রিচুয়ালস আন্ডার অকুপেশন’ এবং ‘মেমোরি অব প্লেসেস’। এসব চিত্রে কিছু উপাদান বারবার ফিরে এসেছে—কৃষক, প্রথাগত সূচিকর্মের পোশাক পরা নারী, জলপাই ও কমলা গাছ, ফিলিস্তিনি গ্রাম, চাবি, কারাগার, চেকপয়েন্ট, কুফিয়া, গম্বুজ (ডোম অব দ্য রক), গমের শীষ ও পায়রা।

মনসুর দূর থেকে ফিলিস্তিনের ছবি আঁকেননি; তিনি উপাদান সংগ্রহ করেছেন খোদ সেই মাটি থেকেই। তাঁর কাছে ফিলিস্তিনের প্রকৃতি কোনো নিছক পটভূমি ছিল না; বরং তা ছিল প্রতীক ও স্মৃতির উৎস।

দখলদারিত্ব ও বিস্মৃতির বিরুদ্ধে শিল্প

১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হলে মনসুরের প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারে যুক্ত হয় নতুন রাজনৈতিক মাত্রা। ইসরাইলি পণ্য বর্জন ও আত্মনির্ভরশীলতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি ক্যানভাসে মাটির স্থানীয় উপাদান ব্যবহার শুরু করেন। তিনি কাদা, খড়, কাঠ, চক, চুন, প্রাণিজ চর্বি ও প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ ব্যবহার করতেন। এমনকি কাদামাটির সঙ্গে সুমাক, জিরা, কফি ও মেহেদির মতো খাদ্য ও গৃহস্থালি উপাদানও মেশাতেন।

ইন্তিফাদার সময় তিনি ‘নিউ ভিশন’ (New Vision) গ্রুপ গঠনে ভূমিকা রাখেন। স্থানীয় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারকে এই গোষ্ঠী শৈল্পিক ও রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এছাড়া তিনি ‘ফিলিস্তিনি আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’, ‘গ্যালারি ৭৯’, জেরুজালেমের ‘আল-ওয়াসিতি আর্ট সেন্টার’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব আর্ট ফিলিস্তিন’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

চিত্রকর্মের পাশাপাশি তিনি শিল্পকলা শিক্ষকতা করেছেন। ‘আল-ফজর’ সংবাদপত্র ও ‘আল-আওদা’ ম্যাগাজিনে কার্টুনিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। রামাল্লাহ, নিউইয়র্ক, শারজাহ, নরওয়ে ও কায়রোতে তাঁর একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সূচিকর্মবিষয়ক গ্রন্থ রচনাতেও তিনি অবদান রেখেছেন।

মনসুর শুরুতেই বুঝেছিলেন, এই লড়াই শুধু ভূমির জন্য নয়; এটি চিত্র ও স্মৃতির লড়াইও। তাঁর শিল্পের মাধ্যমে তিনি ফিলিস্তিনিদের পরিচয় ও মানবতাকে বিকৃত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।

এর একটি দৃষ্টান্ত তাঁর শিল্পকর্মে ‘পবিত্র পরিবার’ বা হোলি ফ্যামিলির (Holy Family) উপস্থিতি। তিনি যীশুকে ফিলিস্তিনি কুফিয়া পরিহিত অবস্থায় চিত্রায়িত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি যীশু ও তাঁর পরিবারের ফিলিস্তিনি শিকড়কে পুনরুদ্ধারের প্রয়াস চালিয়েছেন।

তাঁর চিত্রে ফিলিস্তিনি নারীরা হয়ে উঠেছেন উর্বরতা, মাতৃভূমি ও শক্তির প্রতীক। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত নারীরা যেমন দেশের সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন, তেমনি মাটির সঙ্গে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথাও জানিয়েছেন।

ট্র্যাজেডির মাঝেও এক সুন্দর ফিলিস্তিন

নাকবা থেকে শুরু করে দখলদারিত্ব, ইন্তিফাদা এবং গাজার সাম্প্রতিক যুদ্ধ—ফিলিস্তিনের প্রতিটি করুণ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছেন তিনি। তবু ফিলিস্তিনের এক সুন্দর প্রতিচ্ছবি ক্যানভাসে ধরে রাখার প্রয়াস কখনো থামাননি।

১৯৮০ সালে তিনি আঁকেন ‘ফিলিস্তিনিয়ান ব্রেকফাস্ট’। তাবুন রুটি, টমেটো, পেঁয়াজ ও জলপাই সাজানো সেই টেবিলকে তিনি ভূমির উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা ও সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। ১৯৯০ সালে আঁকেন ‘অলিভ হারভেস্ট’।

মনসুরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পরিষ্কার—ফিলিস্তিনের সৌন্দর্য রক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং এটিও এক ধরনের প্রতিরোধ (Resistance)। ঘরবাড়ি, জলপাই গাছ, পোশাক ও খাবারের দৈনন্দিন বিবরণ যখন শিল্পে রূপ নেয়, তখন তা হয়ে ওঠে স্মৃতির দুর্গ।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে গাজার ক্রমবর্ধমান ট্র্যাজেডি তাঁকে গভীরভাবে শোকাহত করেছিল। তবু তিনি তাঁর নীতিতে অটল ছিলেন—তিনি সৌন্দর্যকে বিসর্জন না দিয়ে ফিলিস্তিনের ছবি এঁকে গেছেন।

ফিলিস্তিনি শিল্প গড়ার কারিগর

মনসুরের অবদান শুধু চিত্রকর্মে সীমাবদ্ধ ছিল না। ফিলিস্তিনি আধুনিক দৃশ্যশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলা এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের তৈরি করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০২৪ সালে তিনি ফিলিস্তিন মিউজিয়ামের জন্য কাদামাটি, খড় ও মেহেদি দিয়ে ‘অন দ্য উইং অব অ্যান এঞ্জেল’ নামের একটি স্থায়ী দেয়ালচিত্র তৈরি করেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ‘ফিলিস্তিন প্রাইজ ফর প্লাস্টিক আর্টস’, ‘ইউনেস্কো-শারজাহ প্রাইজ ফর আরব কালচার’ এবং ‘নাইল অ্যাওয়ার্ড ফর আরব ক্রিয়েটর্স’-সহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

যে চিত্রকর্মটি অসম্পূর্ণ রয়ে গেল

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তুলি ছাড়েননি। মৃত্যুর এক বছর আগে ৭৯তম জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুরাগীদের সঙ্গে রসিকতা করে বলেছিলেন, প্রতিবার মোমবাতি নেভানোর সময় তাঁর মনে হয় বয়স যেন এক বছর কমে যাচ্ছে। হয়তো অসুস্থতার ভার কিছুটা হালকা করারই চেষ্টা ছিল সেটি।

‘শারক আল-আওসাত’ (Asharq Al-Awsat)-কে দেওয়া তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এমন কোনো স্বপ্নের ছবি আছে কি না, যা তিনি এখনো আঁকতে পারেননি। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি ‘প্লাস্টিক সার্জারি ছাড়া’ একটি স্বাধীন ও সুন্দর ফিলিস্তিনের ছবি আঁকার স্বপ্ন দেখেন।

তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, কোনো রাজনৈতিক বিকৃতি বা বিতর্কিত বয়ান ছাড়া ফিলিস্তিনকে তার প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক ও মানবিক সৌন্দর্যে দেখতে চান।

মনসুর সেই ছবিটি এঁকে যাওয়ার আগেই চলে গেছেন। কিন্তু পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অন্যভাবে সেই একই ছবি এঁকে গেছেন। ফিলিস্তিনকে তিনি মাটির রূপ দিয়েছেন, জেরুজালেম, জলপাই গাছ, নারী, চাবি ও সংগ্রামের রূপ দিয়েছেন। ‘দ্য ক্যামেল অব হার্ডশিপস’ থেকে শুরু করে তাঁর শেষ সৃষ্টি পর্যন্ত—স্লিমান মনসুরের তুলি কেবল ক্যানভাস রাঙায়নি; বরং একটি আস্ত মাতৃভূমিকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বহন করে নিয়ে গেছে।

শিল্পী চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর আঁকা ফিলিস্তিন রয়ে গেছে—এক অপরাজেয় সৌন্দর্য, স্মৃতি ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে।


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন