স্বর্ণ, কাগজী মুদ্রা ও রিবা : পার্থক্যটি যেভাবে বুঝতে হবে
লেখক:
প্রাচীন মুদ্রার ক্লোজ-আপ দৃশ্য
অর্থের ইতিহাস শুরু হয়েছিল পণ্য বিনিময় বা বার্টার প্রথার মাধ্যমে। তখন একটি পণ্যের বিনিময়ে অন্য পণ্য দেওয়া হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সোনা ও রূপার মতো মূল্যবান ধাতু বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এর প্রাচীন উদাহরণ হিসেবে লিডিয়ান লায়ন মুদ্রার কথা উল্লেখ করা যায়। পরবর্তীতে রাজকীয় প্রতীক সংবলিত ধাতব মুদ্রা চালু হয়, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ছিল। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশের ধারাবাহিকতায় একসময় কাগজী মুদ্রা এবং বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থারও প্রচলন ঘটেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ‘টাকা’ রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রিবা বা সুদ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা বলে—ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন...” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)।
‘রিবা’ একটি বহুল ব্যবহৃত আরবি শব্দ। সাধারণভাবে এর অর্থ সুদ বা ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ। তবে কেউ কেউ রিবাকে আরও বিস্তৃত অর্থে অর্থনৈতিক অবিচার হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন। যেমন—শ্রমিককে ন্যায্য মজুরি না দেওয়া, প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের অর্থ আত্মসাৎ করা কিংবা শেয়ারবাজারে কারসাজি করে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া অর্থনৈতিক অবিচারের উদাহরণ হতে পারে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের রৌপ্য দিরহাম এবং রোমান-বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের স্বর্ণ দিনার প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান স্বতন্ত্র ইসলামি স্বর্ণ দিনার ও রৌপ্য দিরহাম চালু করেন। এসব মুদ্রায় মানুষের ছবি বাদ দিয়ে আরবি ক্যালিগ্রাফি, কুরআনের আয়াত এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’সহ বিভিন্ন ইসলামি বাণী খোদাই করা হয়।
স্বর্ণ দিনার ও রৌপ্য দিরহামের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যা আধুনিক কাগজী মুদ্রার ক্ষেত্রে দেখা যায় না। প্রথমত, এগুলোর নিজস্ব বা অন্তর্নিহিত মূল্য ছিল। কারণ এগুলো তৈরি হতো সোনা বা রূপার মতো মূল্যবান ধাতু দিয়ে। অর্থাৎ মুদ্রা হিসেবে এর ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেলেও সোনা বা রূপা হিসেবে এর মূল্য থেকে যেত।
দ্বিতীয়ত, স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রার দুটি মূল্য ছিল—একটি এর ব্যবহারিক মূল্য এবং অন্যটি বিনিময়মূল্য। তৃতীয়ত, কোনো সরকার যদি এসব মুদ্রাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধ মুদ্রা হিসেবে বাতিলও করত, তবুও সোনা বা রূপা হিসেবে এর অন্তর্নিহিত মূল্য নষ্ট হয়ে যেত না।
অন্যদিকে, আধুনিক কাগজী মুদ্রা বা ফিয়াট মানির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। কাগজের নোটের নিজস্ব বা অন্তর্নিহিত মূল্য অত্যন্ত সামান্য। এর মূল্য মূলত রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, আইনি বৈধতা এবং মানুষের আস্থার ওপর নির্ভর করে। সরকার যখন কোনো মুদ্রাকে আইনগতভাবে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং মানুষ তা গ্রহণ করে, তখন সেটি অর্থ হিসেবে কার্যকর হয়।
কাগজী মুদ্রাকে কোনো আর্থিক সম্পদের প্রতিনিধিত্বকারী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা গেলেও এটি সরাসরি সোনা বা রূপার সমতুল্য নয়। সরকার যদি কোনো কাগজী মুদ্রা বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং সেটির বৈধতা বাতিল করে, তাহলে মুদ্রা হিসেবে তার কার্যকারিতা প্রায় পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। তখন সেটি মূলত কাগজের একটি টুকরোতে পরিণত হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—বাংলাদেশি টাকা বা মার্কিন ডলার আসলে কিসের ভিত্তিতে ইস্যু করা হয়?
একসময় আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থায় মার্কিন ডলার সোনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে ডলারকে সোনায় রূপান্তরের সুযোগ ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারের সোনায় রূপান্তরযোগ্যতার অবসান ঘটান। এর পর থেকে আধুনিক মুদ্রাব্যবস্থা মূলত ফিয়াট মুদ্রাব্যবস্থায় পরিণত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশি টাকা কিংবা মার্কিন ডলার নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনার বিপরীতে ইস্যু করা হয় না। এসব মুদ্রার মূল্য নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মুদ্রানীতি এবং জনগণের আস্থার ওপর। অর্থাৎ আধুনিক অর্থব্যবস্থায় মুদ্রার মূল্য মূলত রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই মুদ্রাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। ২০২০ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অর্থনীতি সচল রাখা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনগণকে সহায়তা করা এবং আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিমাণগত সহজীকরণ বা কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (QE)-এর মতো নীতি গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ তারল্য যুক্ত হয়। এই অর্থ সোনা বা কোনো নির্দিষ্ট ভৌত সম্পদের বিপরীতে সরাসরি তৈরি হয়নি; বরং আধুনিক ফিয়াট মুদ্রাব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেই অর্থের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার পেছনে এই অতিরিক্ত তারল্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
এখানেই স্বর্ণমুদ্রা ও কাগজী মুদ্রার মৌলিক পার্থক্যটি সামনে আসে। স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রার ক্ষেত্রে মুদ্রার নিজস্ব ধাতব মূল্য থাকে। অন্যদিকে কাগজী মুদ্রার মূল্য মূলত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মানুষের আস্থার ওপর নির্ভরশীল।
দীর্ঘ সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, কাগজী মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা সাধারণত মূল্যস্ফীতির কারণে কমতে পারে, আর একই সময়ে সোনার দাম সেই মুদ্রায় বাড়তে পারে। অর্থাৎ সোনাকে একটি তুলনামূলক মানদণ্ড হিসেবে ধরলে, কাগজী মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই মুদ্রায় সোনার দাম বেড়ে যেতে পারে।
এখন মূল আলোচনায় আসা যাক—স্বর্ণ ও কাগজী মুদ্রার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ বা সুদের বিষয়টি কি একইভাবে প্রযোজ্য?
এখানে বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। সোনা ও রূপার মতো পণ্যের নিজস্ব মূল্য রয়েছে এবং এগুলো নিজেরাই মূল্যবান সম্পদ। অন্যদিকে কাগজী মুদ্রা মূলত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে অর্থ হিসেবে কার্যকর। তাই স্বর্ণমুদ্রা এবং কাগজী মুদ্রার লেনদেনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থের প্রকৃতি একভাবে বিচার করা যায় কি না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন।
কোনো ঋণের বিনিময়ে নির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে সেটি রিবার অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু মুদ্রার নাম নয়; বরং লেনদেনের প্রকৃতি, চুক্তির ধরন এবং সংশ্লিষ্ট শরিয়াহ নীতিগুলো বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষ করে স্বর্ণ, রূপা ও আধুনিক কাগজী মুদ্রার পার্থক্য না বুঝে শুধু বাহ্যিকভাবে একই ধরনের লেনদেনকে একই বিধানের আওতায় ফেলা বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। তাই সুদ বা রিবা সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে মুদ্রার প্রকৃতি, লেনদেনের ধরন এবং ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতি—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি। কারণ অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়কে ভুলভাবে বোঝার ফলে একজন মানুষ অজান্তেই এমন একটি চুক্তিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন, যা শরিয়াহর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
সুতরাং স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা, কাগজী মুদ্রা এবং আধুনিক ফিয়াট মুদ্রার প্রকৃতি ও পারস্পরিক পার্থক্য বোঝার পাশাপাশি রিবা বা সুদের বিধান বোঝার জন্য সংশ্লিষ্ট ইসলামি অর্থনীতি ও ফিকহের নীতিগুলোও গভীরভাবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।
লেখক সম্পর্কে
মো: মশিউর রহামান



