মুসলিম বিশ্বের অকৃত্রিম বন্ধু জন এস্পোসিটো আর নেই

পড়তে ১ মিনিট

জন এল এস্পোসিটো (১৯৪০-২০২৬)

অধ্যাপক জন এল এস্পোসিটোর দুঃখজনক প্রয়াণে মুসলিম বিশ্ব কেবল একজন ইসলাম বিশেষজ্ঞকেই হারায়নি, বরং হারিয়েছে মুসলিম স্বার্থের এক পরম সুহৃদ এবং অতুলনীয় মুখপাত্রকে।

​মধ্যপ্রাচ্য ও ধর্মীয় বিষয়ক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পণ্ডিত অধ্যাপক এস্পোসিটো পশ্চিমাদের কাছে ইসলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় উৎসর্গ করেছিলেন। ফলে, তিনি ইসলাম এবং মুসলিম-পশ্চিমা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন।

​প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যাপক ইসমাঈল রাজি আল-ফারুকীর ছাত্র জন এল. এসপোসিতো পঞ্চাশেরও বেশি বই ও অন্যান্য একাডেমিক গ্রন্থ রচনা, সহ-রচনা এবং সম্পাদনা করেছেন। এর মধ্যে অনেকগুলোই বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে মানসম্মত রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অত্যন্ত মূল্যবান এই কাজগুলো ডজনখানেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যা এস্পোসিটোকে ইসলামের ওপর অন্যতম সেরা পশ্চিমা পণ্ডিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং মুসলিম সমাজে তাঁকে এক অনন্য নায়কের মর্যাদা দিয়েছে। তিনি যেখানেই গেছেন—পাকিস্তান, মালয়েশিয়া বা তুরস্ক—ব্রুকলিনের এই ইতালীয়-আমেরিকান ক্যাথলিক পণ্ডিতকে মানুষ একজন রক স্টারের মতো বিপুল উৎসাহে বরণ করে নিয়েছে।

​তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে : ভয়েসেস অফ রিজার্জেন্ট ইসলাম, মেকার্স অফ কনটেম্পোরারি ইসলাম, ইসলাম : দ্য স্ট্রেইট পাথ, ইসলাম অ্যান্ড পলিটিক্স, দ্য ইসলামিক থ্রেট: মিথ অর রিয়েলিটি?, হোয়াট এভরিওয়ান নিডস টু নো অ্যাবাউট ইসলাম, দ্য ফিউচার অফ ইসলাম, হু স্পিকস ফর ইসলাম? হোয়াট আ বিলিয়ন মুসলিমস রিয়েলি থিংক (ডালিয়া মোজাহেদের সাথে যৌথভাবে), শরীয়াহ: হোয়াট এভরিওয়ান নিডস টু নো (নাতানা জে. ডেলং-বাসের সাথে যৌথভাবে), এবং ইসলামোফোবিয়া: দ্য চ্যালেঞ্জ অফ প্লুরালিজম ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি। ৯/১১-এর হামলার পর প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ আনহোলি ওয়ার: টেরর ইন দ্য নেম অফ ইসলাম একদিকে যেমন সন্ত্রাসীদের দ্বারা ধর্মের অপব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, তেমনি অন্যদিকে একটি সমগ্র সভ্যতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য যারা সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, তাদেরও কড়া জবাব দিয়েছিল।

​এস্পোসিটো অক্সফোর্ডের প্রধান প্রধান রেফারেন্স বইগুলোর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে দ্য অক্সফোর্ড ডিকশনারি অফ ইসলাম, দ্য অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অফ ইসলাম, এবং দ্য অক্সফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অফ দ্য ইসলামিক ওয়ার্ল্ড।

​স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর, পরাশক্তিগুলো যখন নিজেদের শক্তির মহড়া বজায় রাখার জন্য নতুন কোনো শত্রুর সন্ধান করছিল, তখন শূন্যস্থান পূরণের জন্য ইসলামই ছিল সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য। যখন তাদের সমস্ত প্রতিষ্ঠান এবং প্রপাগান্ডা মেশিনকে প্রায় ২০০ কোটি অনুসারীর এই ধর্ম এবং মুসলিম পণ্ডিতদের দানবীয় রূপে চিত্রিত করার কাজে নামানো হয়েছিল, তখন অধ্যাপক এস্পোসিটো তাঁর সাহসী পাণ্ডিত্য নিয়ে পাথরের মতো অবিচল দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে মুসলিমদের সম্পর্কে তৈরি করা ভুল ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, আন্তঃধর্মীয় সংলাপের প্রসার ঘটিয়েছিলেন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষার্থী, গবেষক, নীতি-নির্ধারক ও ধর্মীয় নেতাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

​পড়াশোনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের বাইরেও এস্পোসিটো বেশ কিছু নেতৃত্বস্থানীয় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিভিন্ন সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রেখেছেন, নীতি-নির্ধারকদের সাথে পরামর্শ করেছেন এবং বিশ্বকোষ সম্পাদনা করেছেন। তিনি 'মিডল ইস্ট স্টাডিজ অ্যাসোসিয়েশন অফ নর্থ আমেরিকা' এবং 'আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ রিলিজিয়ন' উভয়েরই সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অনন্য অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হন, যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ রিলিজিয়নের 'মার্টিন ই. মার্টি অ্যাওয়ার্ড ফর দ্য পাবলিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং অফ রিলিজিয়ন' এবং পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলোর অন্যতম 'কায়েদ-ই-আজম অ্যাওয়ার্ড' (ইসলামী গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য)।

​অধ্যাপক এস্পোসিটো জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে ধর্ম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক এবং ইসলামী শিক্ষার 'ইউনিভার্সিটি প্রফেসর' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি ১৯৯৩ সালে 'সেন্টার ফর মুসলিম-ক্রিশ্চিয়ান আন্ডারস্ট্যান্ডিং' প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে তিনি এই কেন্দ্রটিকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সাহায্য করেছিলেন।

কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি 'কলেজ অফ দ্য হোলি ক্রস'-এ প্রায় বিশ বছর কাটিয়েছিলেন, যেখানে তিনি বিশ্ব ধর্মতত্ত্ব পড়াতেন, ধর্মীয় শিক্ষা বিভাগের সভাপতিত্ব করেন এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর গ্রন্থপঞ্জির ব্যাপকতা অনেক সময় তাঁর আরও বড় অর্জনকে আড়াল করে ফেলে। তিনি এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, যার মাধ্যমে মুসলমানদের চিরস্থায়ী সন্দেহভাজন হিসেবে নয়, বরং ইতিহাসের সক্রিয় নির্মাতা ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হয়।

​আজীবন একজন একনিষ্ঠ ক্যাথলিক হওয়া সত্ত্বেও অধ্যাপক এস্পোসিটো নিজে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন যে, কীভাবে গভীর ব্যক্তিগত বিশ্বাস বজায় রেখেও অন্যান্য ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি পরম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা সম্ভব। তাঁর পাণ্ডিত্য ও গবেষণা সবসময় এই বার্তাটিই জোর দিয়ে প্রচার করেছে যে—ভীতি নয়, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়াই হওয়া উচিত মুসলিম এবং বৃহত্তর বিশ্বের মধ্যকার সম্পর্কের মূল ভিত্তি।

​২০২৬ সালের ১৫ জুলাই ৮৬ বছর বয়সে অধ্যাপক জন এল এস্পোসিটো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই প্রয়াণে মুসলিম বিশ্ব এবং সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক একাডেমিক অঙ্গন ইসলামের অন্যতম প্রভাবশালী ও সম্মানিত একজন পণ্ডিতকে হারালো।

​আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, অধ্যাপক এস্পোসিটোর সুবিশাল একাডেমিক কর্মভাণ্ডার ও গবেষণামূলক কর্ম যেন আগামী প্রজন্মকেও সততা, সহানুভূতি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার অঙ্গীকার নিয়ে জ্ঞান অন্বেষণে একইভাবে অনুপ্রাণিত করে যায়!

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন