মক্কা চুক্তি যেভাবে খুলতে পারে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার

পড়তে ১ মিনিট

শেহবাজ শরিফের সঙ্গে করমর্দন করছেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান; পাশে মোহাম্মদ বিন সালমান।- এএফপি

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু নতুন একটি নিরাপত্তা জোটের ভিত্তি তৈরি করছে না; বরং তিন দেশের মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মুসলিম বিশ্বের পবিত্র নগরী মক্কায় শুক্রবার স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। মূলত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলাই চুক্তিটির প্রধান লক্ষ্য।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটিকে শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এটি আঙ্কারা, রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে বিদ্যমান কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর করে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার বিস্তৃত ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক সৌদি আরব ও পাকিস্তান—উভয় দেশের সঙ্গেই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব তুরস্কের তৈরি ড্রোন কেনার বিষয়ে সম্মত হয়। তুরস্ক এটিকে সে সময় দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

অন্যদিকে, তুরস্ক ও পাকিস্তান নৌ প্রকল্প, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন যৌথ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত করেছে। ২০১৮ সালে দুই দেশ ‘মিলগেম’ প্রকল্প শুরু করে। এর আওতায় পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্য চারটি কর্ভেট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে তুরস্কে নির্মিত দুটি যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যে পাকিস্তানের নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে।

অর্থনীতি ও জ্বালানিতে নতুন সম্ভাবনা

বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা চুক্তির সম্ভাবনা শুধু নিরাপত্তা খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনীতি, জ্বালানি ও বাণিজ্যেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়া এবং লোহিত সাগরে সাম্প্রতিক অস্থিরতা বিকল্প জ্বালানি ও বাণিজ্যিক রুটের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে। এই পরিস্থিতিতে তুরস্ক নিজেকে আঞ্চলিক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

আঙ্কারা দক্ষিণে ইরাকের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন সম্প্রসারণের পক্ষে কাজ করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি এবং তেল-গ্যাস খাতে ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের কারণে তুরস্ক আঞ্চলিক জ্বালানি হাব হিসেবে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে।

তুর্কিভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনএন তুর্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ্লেষক জাকেরিয়া শাহিন বলেন, মক্কায় স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয় নয়; এর ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে।

তিনি বলেন, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব—তিনটিই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। ফলে চুক্তিটির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ও এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে যে নতুন রাজস্ব ও বিনিয়োগের প্রবাহ তৈরি হতে পারে, সেগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শাহিনের মতে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশ এই ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। শনিবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও ইঙ্গিত দিয়েছেন, মিশর ভবিষ্যতে এই জোটে যোগ দিতে পারে।

শাহিন আরও বলেন, এই কৌশলগত চুক্তি ভবিষ্যতে একটি নতুন ‘উপসাগরীয় চুক্তি’র ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এর ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে তুরস্কের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

উন্নত প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তুরস্ক শিগগিরই বিশ্বের শীর্ষ ১০ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় প্রবেশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

বাড়ছে বাণিজ্যিক সম্পর্ক

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের বাণিজ্যিক সম্পর্কও ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্যেও কাজ করছে আঙ্কারা।

গত মাসে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-তুরস্ক বিজনেস কনফারেন্সে দুই দেশের কর্মকর্তারা লজিস্টিকস, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন খাতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিষয়ক প্রভাষক অ্যান্ড্রিয়াস ক্রিগ এএফপিকে বলেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একে অপরের জন্য অনন্যভাবে পরিপূরক।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের শক্তিশালী কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রতিফলনও সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। গত জুনে উপসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৮২৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।

তুর্কি রপ্তানিকারক পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় চলতি বছরের জুনে সৌদি আরবে তুরস্কের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে—প্রায় ২২৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার। ফলে সৌদি আরব তুরস্কের সবচেয়ে বড় উপসাগরীয় রপ্তানি বাজারে পরিণত হয়েছে।

দুই দেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচিও এই বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সৌদি আরবের অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে তুরস্কের বিশ্বখ্যাত নির্মাণ ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত ‘ডেভেলপমেন্ট রোড প্রজেক্ট’ তুরস্ককে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সংযোগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে সম্ভাবনা তৈরি করেছে, মক্কা চুক্তি সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের শুরুতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি আন্তঃসরকারি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৩৮ কোটি। তুলনামূলকভাবে তরুণ ও গতিশীল এই বিপুল জনগোষ্ঠী তিন দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, পর্যটন ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য বড় বাজার তৈরি করতে পারে।

ফলে মক্কায় স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি আগামী দিনে শুধু একটি নিরাপত্তা কাঠামো নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও তুরস্ককে ঘিরে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র : ডেইলি সাবাহ



এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন