ফিলিস্তিন ও আমাদের করণীয়

পড়তে ১ মিনিট

ফিলিস্তিন ও আমাদের করণীয়

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

“মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে করা অঙ্গীকারে বিশ্বস্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, কেউ কেউ এখনো অপেক্ষায় আছে; তারা তাদের আদর্শে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনেনি।” (আল-আহযাব: ২৩)

অস্তিত্ব রক্ষার চরম সংকট

ফিলিস্তিন ইস্যু আজ তার ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইহুদিবাদী ও পশ্চিমা ঔদ্ধত্য আজ চরমে। নির্বিচারে হত্যা, গণ-বাস্তুচ্যুতি, হাসপাতাল ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং অমানবিক অর্থনৈতিক অবরোধ এক বিভীষিকাময় রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনেই শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ হাজার হাজার নিরপরাধ ফিলিস্তিনি শহীদ হচ্ছেন- ইতিমধ্যেই এই সংখ্যা ৭২,০০০ ছাড়িয়েছে। জায়নবাদী অপশক্তি ফিলিস্তিনিদের অধিকার চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এক সুদূরপ্রসারী ও নিখুঁত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

গাজায় নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ

মাত্র ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের গাজা উপত্যকায় এখন পর্যন্ত ২,০০,০০০ টনেরও বেশি বিস্ফোরক, বোমা ও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এই ধ্বংসলীলা আধুনিক ইতিহাসের যেকোনো যুদ্ধকে হার মানায়। গাজার দুই-তৃতীয়াংশ ঘরবাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ। বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সামগ্রিক অবকাঠামোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং এমনকি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ও জাতিসঙ্ঘের ভবনগুলোকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। এটি নিছক যুদ্ধ নয়, বরং একটি পরিকল্পিত জাতিগত নির্মূল অভিযান- যার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরো বিশ্ব।

মুসলিম উম্মাহর দায়বদ্ধতা

একদল জায়নবাদী নিয়মিত পবিত্র আল-আকসা মসজিদকে অপবিত্র করছে, মুসলমানদের লাঞ্ছিত করছে- অথচ গোটা মুসলিম বিশ্ব আজ নির্বিকার। অথচ নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন:

“একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের ভাই। সে তার প্রতি অবিচার করে না এবং তাকে শত্রুর হাতে তুলে দেয় না। যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন। আর যে কোনো মুসলমানের কষ্ট লাঘব করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট লাঘব করবেন।” (সহীহ মুসলিম)

গাজা ও পশ্চিম তীরে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে বন্দী করে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ, অথচ তারা দখলদার বাহিনীর গুটিকয়েক যুদ্ধবন্দী সেনার মুক্তি নিয়ে সোচ্চার। তারা বিস্মৃত হয়েছে যে, দখলদারিত্বই হলো সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা ফিলিস্তিনিদের আইনগত ও নৈতিক অধিকার।

জেরুজালেম ও আল-আকসার বর্তমান হুমকি

কেবল গাজা নয়, পশ্চিম তীরও আজ দখলদারদের নির্মম থাবায় বিধ্বস্ত। আমাদের পবিত্র জেরুজালেম শহরকে ‘ইহুদিকরণ’-এর নীল নকশা চলছে। মুসলমানদের প্রথম কিবলা এবং বরকতময় আল-আকসা মসজিদ আজ ধ্বংসের হুমকির মুখে। গত ৩০ বছরের তথাকথিত ‘শান্তি আলোচনা’ বা ‘অসলো চুক্তি’ ফিলিস্তিনিদের জন্য বসতি স্থাপন ও ভূমি দখল বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনেনি। ফিলিস্তিন কোনো আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং এটি সমগ্র আরব ও ইসলামি বিশ্বের পবিত্র ভূমি। এর ওপর আগ্রাসন মানেই হলো গোটা উম্মাহর ওপর আঘাত।

আমাদের আশু কর্তব্য

ফিলিস্তিনিদের বস্তুগত ও নৈতিক সমর্থন দেওয়া আজ প্রতিটি মুসলমানের ওপর অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা বা তাদেরকে অনাহারে মরতে দেওয়া একটি জঘন্যতম পাপ। এ বিষয়ে আমাদের করণীয়সমূহ:

  • সর্বাত্মক সমর্থন: রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সংবাদমাধ্যমসহ সকল উপায়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে জনমত গঠন ও ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা।

  • মানসিক সংহতি: মুমিনরা এক দেহের মতো। ফিলিস্তিনের ব্যথায় ব্যথিত হওয়া এবং তাদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা আমাদের ঈমানি দায়িত্বের সর্বনিম্ন স্তর।

  • সচেতনতা বৃদ্ধি: দখলদারদের অপপ্রচার রুখে দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের কথা বিশ্বমঞ্চে ও নিজ নিজ আঙিনায় প্রচার করা।

  • অর্থনৈতিক বয়কট: জায়নবাদী শত্রুদের সমর্থনকারী ও অর্থায়নকারী সকল প্রতিষ্ঠানের পণ্য বর্জন করা এবং দখলদারদের সাথে যেকোনো ধরণের ‘স্বাভাবিকীকরণ’ বা রাজনৈতিক সখ্যতার প্রতিবাদ জানানো।

শেষ কথা

নবী মুহাম্মদ (সা.) যে সাতটি কাজের আদেশ দিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো- “নিপীড়িতকে সমর্থন করা।” ফিলিস্তিনিরা আজ সেই নিপীড়নের চরম সীমায় দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

আসুন আমরা মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, যেন তিনি অদূর ভবিষ্যতে আমাদের বিজয়ী ও মুক্তিদাতা হিসেবে পবিত্র আল-আকসা মসজিদে সিজদা করার তৌফিক দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী। #

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন