এপস্টাইন ফাইলস : যেভাবে পাশ্চাত্যের নৈতিক মুখোশ ধসে পড়েছে

পড়তে ১ মিনিট

এপস্টাইন ফাইলস : যেভাবে পাশ্চাত্যের নৈতিক মুখোশ ধসে পড়েছে

জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত নথিপত্র জনসমক্ষে আসার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভাষ্যকার ও বিশ্লেষকদের মতে, এই ফাইলগুলো কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়, বরং পশ্চিমা অভিজাত শ্রেণির নৈতিক দেউলিয়ার এক গভীর প্রমাণ। এই কেলেঙ্কারিকে ব্যাপকভাবে একটি ‘কাঠামোগত অবক্ষয়’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে সম্পদ ও ক্ষমতা ব্যক্তিদের আইনের ঊর্ধ্বে কাজ করার সুযোগ করে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক কর্তৃত্বকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।

লেখক এই নিবন্ধে অধ্যাপক এডওয়ার্ড সাঈদের যুগান্তকারী কর্ম ‘ওরিয়েন্টালিজম’-এর ব্যাপক সহায়তা নিয়েছেন, যাতে পশ্চিমা বিশ্বের সমগ্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মূলে থাকা সেই নৈতিক ছদ্মবেশ বা মুখোশটি উন্মোচিত করা যায়।

এডওয়ার্ড সাঈদের যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘ওরিয়েন্টালিজম’-এ উন্মোচিত বুদ্ধিবৃত্তিক বিকৃতি থেকে শুরু করে জেফরি এপস্টাইন কাণ্ডে প্রকাশিত নৈতিক পচনÑপাশ্চাত্যের অত্যন্ত যত্ন সহকারে তৈরি করা সেই ‘সচ্চরিত্রের ভাবমূর্তি’ শেষ পর্যন্ত ধসে পড়েছে।

অধ্যাপক সাঈদ (১৯৩৫-২০০৩) সেই বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোটি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব ইসলাম ও মুসলিম সমাজকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করত। ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এই পণ্ডিত আধুনিক বিশ্বের সংস্কৃতি, পরিচয় এবং ক্ষমতা বোঝার ধরনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি উন্মোচন করেন যে, কীভাবে জ্ঞানকেই আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ‘ওরিয়েন্ট’ বা প্রাচ্য (মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকাসহ পূর্বদিকের দেশগুলো) কোনো পণ্ডিতদের আবিষ্কৃত বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত কল্পনাÑএকটি আয়না যেখানে ইউরোপ তাদের নিজস্ব ভয়, কল্পনা এবং শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা প্রতিফলিত করত।

মুসলিমদের তুলে ধরা হতো অযৌক্তিক, ইন্দ্রিয়পরায়ণ এবং অনগ্রসর হিসেবে, যাদের ওপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে; অন্যদিকে ইউরোপ নিজেকে উপস্থাপন করত যৌক্তিক, নৈতিক এবং সভ্য হিসেবে। সাঈদের সমালোচনা ছিল অত্যন্ত বিধ্বংসী: তিনি দেখিয়েছেন যে এই চিত্রায়নগুলো কোনো নির্দোষ প্রাতিষ্ঠানিক ভুল ছিল না, বরং এগুলো ছিল ক্ষমতার হাতিয়ার।

এই ধারণাগুলোই ঔপনিবেশিক শাসন, সাংস্কৃতিক অহমিকা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো।

পুরো একটি সভ্যতাকে ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত করার মাধ্যমে পাশ্চাত্য তার নিজস্ব নৈতিক অসঙ্গতি এবং ঐতিহাসিক সহিংসতাকে আড়াল করে রেখেছিল। সাঈদ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যবাদ আসলে ইসলামকে বোঝার জন্য নয়, বরং পশ্চিমা আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

বর্তমানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইতিহাস এক তিক্ত পরিহাস বয়ে এনেছে। যখন মুসলিমদের নিরন্তরভাবে নৈতিকভাবে সন্দেহভাজন এবং সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চাৎপদ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছিল, তখন পাশ্চাত্যের নিজস্ব অভিজাত শ্রেণিÑযারা নিজেদের নৈতিক ক্ষমতার দাবিদার বলে মনে করতÑতারা আজ জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।

এপস্টাইন সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো তাদের সেই ঘষামাজা এবং মার্জিত ‘ভদ্রতার মুখোশ’ ছিঁড়ে ফেলেছে।

সেখানে যা বেরিয়ে এসেছে তা কেবল একজন অপরাধীর কেলেঙ্কারি নয়, বরং এটি একটি সংরক্ষিত ব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ; যেখানে সম্পদ, ক্ষমতা এবং প্রভাব একত্রিত হয়ে শিকারিদের সুরক্ষা প্রদান করত।

অল্পবয়সী মেয়েদের পাচার করা হয়েছে, প্রলুব্ধ করা হয়েছে, লাঞ্ছিত করা হয়েছে এবং তাদের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছেÑকোনো দূরের ‘অসভ্য’ ভূখণ্ডে নয়, বরং পশ্চিমা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। ব্যক্তিগত জেট বিমান, বিলাসবহুল প্রাসাদ, গোপন দ্বীপ এবং আইনি মারপ্যাঁচে করা ধামাচাপাÑসব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এই নৈতিক পচনের অবকাঠামো। টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে সুযোগ; প্রভাব দিয়ে কেনা হয়েছে নীরবতা; আর ক্ষমতা দিয়ে কেনা হয়েছে দায়মুক্তি। এখানেই ‘প্রাচ্যবাদ’ বা ওরিয়েন্টালিজমের এক গভীর বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়।

শত শত বছর ধরে পাশ্চাত্য মুসলিম সমাজগুলোকে যৌন বিকৃতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের আধার হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। অথচ আজ আমরা পশ্চিমা সম্পদ ও প্রভাবের সর্বোচ্চ মহলেই সংঘবদ্ধ লালসা ও পৈশাচিকতা প্রত্যক্ষ করছিÑযা ছিল সুসংগঠিত, সুপরিকল্পিত এবং এমন সব প্রতিষ্ঠান দ্বারা সুরক্ষিত, যাদের কাজ ছিল ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখা।

সাঈদ উন্মোচন করেছেন যে, কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে ইসলামের একটি বিকৃত চিত্র উদ্ভাবন করেছিল।

এপস্টাইন সংক্রান্ত তথ্যগুলো আরো বেশি অস্বস্তিকর কিছু উন্মোচিত করে: তা হলো, বিশ্বকে নীতি-নৈতিকতার সবক দিলেও পশ্চিমা অভিজাতরা তাদের সেই মার্জিত আবরণের নিচে চরম শোষণের লালনপালন করেছে।

ইসলামী শিক্ষা শালীনতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্বলদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে। অথচ মুসলিমদের উপস্থাপন করা হয়েছিল সভ্যতার প্রতি হুমকি হিসেবে।

ইতোমধ্যে, বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংবাদমাধ্যমের কারিগররাÑযারা অন্যদের মানবাধিকার নিয়ে উপদেশ দিতেনÑনিজেরাই এমন সব অপরাধে জড়িয়ে ছিলেন যা মানবতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে।

‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যবাদ ছিল মূলত বয়ান বা ন্যারেটিভকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি কৌশল।

অন্যদিকে, এপস্টাইন সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো হলো সেই নিয়ন্ত্রণের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। এই দু’টি বিষয় মিলে একটি চরম সত্য উন্মোচন করে: পাশ্চাত্য যে নৈতিক আধিপত্যের কাঠামো তৈরি করেছিল, তা কখনোই সচ্চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে ছিল না, বরং তা ছিল ক্ষমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ক্ষমতা যখন কথা বলে, তখন সে নিজেকেই সঠিক বলে দাবি করে। কিন্তু ক্ষমতা যখন উন্মোচিত হয়, তখন তার ভণ্ডামি নগ্ন হয়ে পড়ে। এপস্টাইন ফাইলগুলো সমাজের সর্বোচ্চ শিখরে সক্রিয় এক বীভৎস ব্যবস্থাকে প্রকাশ করে দিয়েছে।

বিমানের যাতায়াত রেকর্ড, গোপন সমঝোতা এবং শিথিল আইনি চুক্তিগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে, সম্পদের সামনে ন্যায়বিচার কত গভীরভাবে নতি স্বীকার করতে পারে।

এপস্টাইন কোনো সমাজবিচ্যুত ব্যক্তি ছিলেন নাÑতিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট, রাজপুত্র, বিলিয়নেয়ার এবং তারকাদের একদম ঘনিষ্ঠ বলয়ের মানুষ। তার ব্যক্তিগত বিমানÑযাকে শিউরে ওঠার মতো নামে ‘ললিতা এক্সপ্রেস’ ডাকা হতোÑঅপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচার করত বিলাসবহুল প্রাসাদ এবং গোপনীয়তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি ব্যক্তিগত দ্বীপে।

পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাদের পণ্যের মতো এক শক্তিশালী ব্যক্তির কাছ থেকে অন্যজনের কাছে হস্তান্তর করা হতো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল সবেমাত্র কিশোরী। বছরের পর বছর ধরে কিছুই হয়নি। অভিযোগগুলো গায়েব হয়ে যেত। তদন্ত থমকে যেত। আইনজীবীরাও অবিশ্বাস্যভাবে নমনীয় আচরণ করতেন।

ন্যায়বিচারের যে কলকব্জা অসহায়দের প্রতি অত্যন্ত নির্মমÑতা অতি-ধনীদের প্রতি রহস্যজনকভাবে কোমল হয়ে পড়েছিল। এটি কেবল অযোগ্যতা ছিল না; এটি ছিল অপরাধের অংশীদারিত্ব। এমনকি সন্দেহজনক অবহেলার মধ্যে ফেডারেল হেফাজতে এপস্টাইনের মৃত্যু সেই লোকটির মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল, যে অনেকের নাম ফাঁস করে দিতে পারত। তা সত্ত্বেও নথিপত্রগুলো টিকে আছে, যা সুযোগ-সুবিধা দ্বারা সুরক্ষিত এক অভিজাত শ্রেণির বিকৃত ও লালসাগ্রস্ত সংস্কৃতিকেই নিশ্চিত করে।

এটি হলো পশ্চিমা বিশ্বের ‘নৈতিক নাট্যশালা’র চরম পতন। কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলিম সমাজকে অনগ্রসর, নিপীড়ক এবং নৈতিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিত্রায়িত করে এসেছে, আর নিজেদের উপস্থাপন করেছে মানবাধিকার ও মর্যাদার রক্ষক হিসেবে। অথচ সুরক্ষিত প্রাসাদ এবং ব্যক্তিগত দ্বীপের আড়ালে পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিরাই গড়ে তুলেছিলেন যৌন শোষণের এক বিশাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা।

এটি দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ছিল না; এটি ছায়ার আড়ালে লুকিয়েও ছিল না, বরং বিলাসিতার মোড়কে সাজানো ছিল। এপস্টাইন সংক্রান্ত প্রকাশনাগুলো অভাব বা নিরুপায় হয়ে করা কোনো অপরাধকে উন্মোচিত করে না; বরং এগুলো প্রকাশ করে বিলাসিতা-চালিত চরম পৈশাচিকতা ও নৈতিক স্খলনকে।

এগুলো এমন এক সংস্কৃতিকে উন্মোচিত করে যেখানে সবকিছুরÑশরীর, নীরবতা এবং ন্যায়বিচারÑএকটি নির্দিষ্ট দাম ছিল। আর এর ক্রেতারা ছিলেন ঠিক সেই ব্যক্তিরাই যারা বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণ করতেন, গণমাধ্যমের বয়ান নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং বিশ্বকে নৈতিকতা নিয়ে সবক দিতেন।

প্রাচ্যবাদ বা ওরিয়েন্টালিজম একসময় বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে যা করেছিলÑঅর্থাৎ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে অন্যদের বিকৃতভাবে উপস্থাপনÑএপস্টাইন ফাইলগুলো নৈতিকভাবে তার ঠিক উল্টোটা করে দেখিয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের সেই বিভ্রম আজ ধসে পড়েছে।

মুখোশ এখন উন্মোচিত। দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম এবং অ-পশ্চিমা সমাজগুলোর ওপর যে ‘বর্বরতা’র তকমা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আজ তা দেখা যাচ্ছে বড় বড় পেন্টহাউস এবং রাজপ্রাসাদগুলোতে। এডওয়ার্ড সাঈদ সতর্ক করেছিলেন যে, ক্ষমতা তার নিজের সহিংসতাকে আড়াল করতে নানা ধরণের মিথ্যা বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করে।

এপস্টাইন কেলেঙ্কারি আজ তা প্রমাণ করে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্ব অন্যদের ‘অনৈতিকতা’র গল্প শুনিয়ে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরিয়ে রেখেছিলÑঅথচ সেই সময়ে তাদেরই শাসক শ্রেণি বন্ধ দরজার আড়ালে সুনিপুণভাবে শোষণের জাল বুনেছে। এখন গল্পের অভিমুখ বদলে গেছে এবং ইতিহাসের মোড় নিজেদের দিকেই ঘুরেছে। আর এতে যা প্রকাশ পেয়েছে, তা কোনো নৈতিক নেতৃত্ব নয়, বরং তা হলো চরম নৈতিক দেউলিয়াত্ব। #



লেখক সম্পর্কে

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন